পুঁজিবাজারে পরিকল্পিত দরপতনের নেপথ্যে কারা, খতিয়ে দেখা উচিত
আলমগীর হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: টানা দরপতনের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না পুঁজিবাজার। ফলে সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় পতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। ফলে টানা পতনে আতঙ্কে ছড়িয়ে পড়ছে পুঁজিবাজার। মুলত ডিএসইর অযাচিত হস্তক্ষেপ ও কারসাজি চক্রের ইন্দনে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না পুঁজিবাজার। তবে পুঁজিবাজারে শেয়ারের তদারকি বা সার্ভেল্যান্সের কারণে যাতে বাজারে ভীতি না ছড়ায়, সে জন্য সুনির্দিষ্ট তথ্যভিত্তিক সার্ভেল্যান্সের নির্দেশ দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ জন্য ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষকে অহেতুক সার্ভেল্যান্সের বদলে তথ্যভিত্তিক সার্ভেল্যান্সের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া পুঁজিবাজারে লভ্যাংশ ঘোষণার ভরা মৌসুম চললেও বাজারের সার্বিক পরিস্থিতিতে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে না। বরং টানা দরপতনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার যথাযথ নজরদারি ও কার্যকর তদারকির অভাবেই পুঁজিবাজার প্রত্যাশিত গতির বিপরীতে পরিচালিত হচ্ছে।
ফলে ভালো লভ্যাংশ ঘোষণার পরও বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরছে না। ফলে আস্থাহীনতায় পুঁজিবাজার থেকে হাত গুটিয়ে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা যার ফলস্বরূপ সাম্প্রতিক সময়ে চরম স্থবিরতায় ধুঁকছে দেশের অর্থনীতির এই প্রধান খাতটি।
তবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হলেও পুঁজিবাজারকে আস্থায় নিতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। প্রতিদিনই বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ ধুঁকছে; বহুজনের পুঁজি হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। মুনাফার আশায় বাজারে এসে সর্বস্বান্ত হওয়া যেন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। সূচকে মাঝে মধ্যে সামান্য উত্থান দেখা দিলেও সার্বিক পরিস্থিতি নিম্নমুখীতে অনিশ্চয়তা ও হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। তবে টানা দরপতন হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যস্ত তদন্ত আর জরিমানা ইস্যুতে।
একাধিক বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, পুঁজিবাজারে টানা দরপতনের পরও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষা যেখানে তাদের মূল দায়িত্ব, সেখানে বাজারে যতটা গভীর সঙ্কট তৈরি হয়েছে তার তুলনায় কার্যকর তৎপরতার ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছেন তারা। অনেকেই বলছেন, বিনিয়োগকারীরা নিঃস্ব হয়ে পড়লেও তা দেখার যেন কেউ নেই।
তাদের প্রশ্ন দেশের পুঁজিবাজারের এই পতন থামাবে কে? এছাড়া পুঁজিবাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে সক্রিয় রয়েছে একটি কারসাজি চক্র। তেমনি বিএনপি সরকার গঠন করার আগে পুঁজিবাজারের শৃঙ্খলা ফেরানো ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন অর্থমন্ত্রী বাজার পুনরুজ্জীবনে একাধিক ইতিবাচক আশ্বাস দেন। এরই ধারাবাহিকতায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন করা হয় তেমনি পুঁজিবাজারে গতি ফেরাতে বেশ কিছু ব্যবসাবান্ধব ও ইতিবাচক পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করা হলেও এর প্রভাব নেই বাজারে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণত লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুমে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ার পাশাপাশি পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে দরপতনের মুখে পড়ছে পুঁজিবাজার। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নজরদারি আরও কঠোর ও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
তেমনি পুঁজিবাজারের বর্তমান দুরবস্থার পেছনে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অস্বাভাবিক তৎপরতা রয়েছে কি না তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দ্রুত প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা। বিশেষ করে বাজারের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহে কারা প্রভাব বিস্তার করছে কিংবা নেপথ্যে থেকে কারসাজির মাধ্যমে বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছে, তা শনাক্ত করতে কার্যকর অনুসন্ধান চালানোর দাবি জানিয়েছেন।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে শীর্ষস্থানীয় একটি ব্রোকারেজ হাউসের প্রধান নির্বাহী বলেন, পুঁজিবাজারে ছোট ও মাঝারি এবং বড় সব শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একধরনের হতাশা ভর করেছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে কেউ বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না। উল্টো অনেকে লোকসান মেনে নিয়ে শেয়ার বিক্রি করে নিস্কিয় হয়ে পড়ছেন। সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দিক থেকে বাজারের পতন থামাতে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় বিনিয়োগকারীদের হতাশা আরও বাড়ছে।
জানা গেছে, সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের পতনে কমেছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর। তবে বেড়েছে টাকার পরিমাণে লেনদেন। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ১৫ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৪১৭ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৩ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ৫০ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ৯ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ২ হাজার ৮৬ পয়েন্টে।
দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৮৮ কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১৪৫ টির, দর কমেছে ১৯০ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৫৩ টির। ডিএসইতে ৫৬৪ কোটি ৬২ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ১২৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বেশি। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৪৪০ কোটি ৯৫ লাখ টাকার।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৪৬ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৫৭৬ পয়েন্টে। সিএসইতে ১৮২ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ৯০ টির দর বেড়েছে, কমেছে ৭১ টির এবং ২১ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ১৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।



