পুঁজিবাজারে গতি ফেরাতে আসছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে গতি ফেরাতে রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি অংশীদারিত্ব থাকা বহুজাতিক ১০টি কোম্পানির শেয়ার পুঁজিবাজারে ছাড়ার উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছে সরকার। প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে কয়েকটি লাভজনক সরকারি কোম্পানি সরাসরি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হবে। আর বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের নিজ নিজ পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
এ বিষয়ে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। সেখানে এই ১০ কোম্পানির অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার পুঁজিবাজারে ছাড়া, নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকসহ সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে পর্যায়ক্রমে তালিকাভুক্ত করা এবং পুঁজিবাজারে নতুন পণ্য চালুর বিষয়ে ১০ দফা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়, ব্যাংক ঋণনির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারকে কেন্দ্রীয় অর্থায়ন প্ল্যাটফর্মে আনতে এখনই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ক্যাপিটাল মার্কেট-১ শাখার উদ্যোগে এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী।
সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক কোম্পানি ও সরকারি অংশীদারিত্ব রয়েছে— এমন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে সরাসরি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার লক্ষ্যে সরকারের গৃহীত উদ্যোগ কতদূর এগোল, ভবিষ্যৎ করণীয় কী তা পর্যালোচনায় উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে আয়োজিত এই বৈঠকে পুঁজিবাজারে সরকারের অংশীদারিত্ব বাড়ানো, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন, নতুন আর্থিক পণ্য চালু এবং ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের বিকল্প হিসেবে পুঁজিবাজার ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈঠক শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও বিনিময় কমিশন), বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য ১০ দফা সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সরকার সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চায় বলে বৈঠকে আলোচিত হয়।
কার্যবিবরণীর তথ্য অনুযায়ী, ১০ দফা নির্দেশনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে: ভালো পারফরম্যান্স দেখানো রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ার অফলোড করে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা। সরকারি অংশীদারিত্ব রয়েছে এমন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে সরকারের শেয়ার কমিয়ে এনে সেগুলোকে পুঁজিবাজারে একীভূত করা।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মুবারেক জানান, প্রাথমিকভাবে পুঁজিবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি মোট ১০টি কোম্পানির তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়ার অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য সর্বশেষ বৈঠকটি হয়েছে। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই কোম্পানিগুলোর মোট শেয়ারের কমপক্ষে ১০ শতাংশ শেয়ার পুঁজিবাজারে ছাড়তে হবে, যার মধ্যে ৫ শতাংশ সরকার পক্ষ থেকে এবং ৫ শতাংশ অন্যান্য শেয়ারহোল্ডার (বিশেষ করে প্যারেন্ট বা মূল কোম্পানি) থেকে আসবে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান জানান, ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড, কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড, সিনোভিয়া ফার্মা পিএলসি এবং নোভার্টিস বাংলাদেশ লিমিটেডকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়েছে।
বিশেষ করে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের বিষয়ে তিনি জানান, যদি বিদেশি বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে ১৫ শতাংশ শেয়ার সরকারের কেনার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়, তবে সেই শেয়ারের একটি অংশ পুঁজিবাজারে অফলোড করা হবে। এছাড়া বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের আওতাধীন কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তি তাদের নিজ নিজ পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বলেও তিনি জানান।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, তার বিভাগের আওতাধীন কোম্পানিগুলোর পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে সমন্বয় করে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সংশ্লিষ্টদের দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট, সরকার এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে আর দীর্ঘসূত্রতা চায় না।
কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে উপস্থিত ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রতিনিধি জানান, তাঁদের পরিচালনা পর্ষদ ইতোমধ্যে একটি রেজ্যুলেশন গ্রহণ করেছে এবং বিষয়টি লন্ডনে কোম্পানির মূল পরিচালনা পর্ষদের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সেখান থেকে চূড়ান্ত নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ইউনিলিভার, নেসলে যদি ভারতের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারে তাহলে এখানে কেন পারবে না? তা ছাড়া আমরাতো চাচ্ছি আমাদের সরকারের মালিকানায় থাকা শেয়ারের একটা অংশ বাজারে আনতে। তাতে কেন তারা বাদ সাধবে?
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনে অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলামের কাছে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এ বৈঠক সম্পর্কে তারা কতটুকু আশাবাদী তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত ২০ বছর থেকে আমরা এটা শুনে আসছি। কিন্তু কোনোভাবেই এটা কার্যকর করা যাচ্ছে না। সরকারের একটি অংশ এটা চায় না। তারা চায় না সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর অংশ দিতে। অথচ এর মাধ্যমেই কোম্পানিগুলোতে স্বচ্ছতা সৃষ্টি হয়।
একটা স্বার্থান্বেষী মহলের কারসাজির কারণেই এটা কার্যকর হচ্ছে না। তা ছাড়া বর্তমান সরকারের হাতে আরে তেমন সময় নেই। তবুও তারা যদি এ সময়ের মধ্যে অন্তত একটি কোম্পানিকেও পুঁজিবাজারে আনতে পারে তাহলে এটি পরবর্তী সরকারের জন্য একটি দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করবে। তখন তারাও বাধ্য হবে এসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে।
এই বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষেত্রে যদি সরকারের মালিকানা থাকে, প্যারেন্ট বোর্ডের (কোম্পানির মূল পরিচালনা পর্ষদ) রেজ্যুলেশন ছাড়া সরকারি অংশ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা সম্ভব নয়। বৈঠকে বিএসইসির সাম্প্রতিক বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক উদ্যোগের প্রশংসা করা হয়, বিশেষ করে করপোরেট গভর্ন্যান্স উন্নয়নের ক্ষেত্রে।
তবে একই সঙ্গে বলা হয়, শুধু নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; বরং নতুন পণ্য উন্নয়ন, বাজারে গতিশীলতা সৃষ্টি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনে আরও প্রো-অ্যাকটিভ ভূমিকা প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটে পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে প্রয়োজনে রেগুলেটরি ফরবিয়ারেন্স বিবেচনার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।



