রেগুলেটরি সংস্কার ছাড়া আস্থা ফিরবে না পুঁজিবাজারে
আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজার প্রায় দেড় দশক ধরে কাঠামোগত দুর্বলতা, নীতিগত অস্থিরতা এবং তদারকি ব্যর্থতার এক দীর্ঘ ছায়ার মধ্যে রয়েছে। ২০১০ সালের বড় ধসের পর বাজার ঘুরে দাঁড়াবে এমন প্রতিশ্রুতি বহুবার এসেছে। কিন্তু বাস্তবে বাজারের ভিত্তি শক্তিশালী হয়নি; বরং অনিয়ম, দুর্বল কোম্পানির আইপিও অনুমোদন, নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন এবং শাস্তির অভাবে কারসাজি সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা গভীর হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের একটি অংশের ভাষ্য, ধারাবাহিক ভুল নীতি ও স্বচ্ছতার ঘাটতি বাজারকে কার্যত ভঙ্গুর করে তুলেছে।
ফলে নির্বাচন পরবর্তী ফের পুঁজিবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। টানা চার কার্যদিবস দরপতনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে পুঁজি হারানোর শঙ্কা বইছে। কারণ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম কার্যদিবস দেশের পুঁজিবাজারে সূচকের বড় উত্থান দেখা গেলেও নির্বাচনের পর টানা চার কার্যদিবসে সূচকের দরপতনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
কারণ বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ছিলো বিএনপি সরকার গঠনের পর পুঁজিবাজার ভালো হবে। তবে ভালো তো দুরের কথা এখন টানা দরপতন ঘটছে। মুলত নির্বাচিত সরকারের সম্ভাব্য নীতি ও নিয়ন্ত্রক অবস্থান নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে বাজারে শেয়ার বিক্রির চাপে সূচকের দরপতন হচ্ছে। এছাড়া রেগুলেটরি সংস্কার ছাড়া পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরবে না বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
মুলত দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরছে না। এই মার্কেট একদিন বাড়ে তিন দিন দরপতন ঘটে। এ অবস্থার মধ্যে বছরের পর বছর পার করছে পুঁজিবাজার। এছাড়া সামষ্টিক অর্থনীতির তীব্র চাপ, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং সুশাসনের অভাব সম্মিলিতভাবে বাজারকে অপরিণত ও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ফলে পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য ভালো মৌল ভিত্তি কোম্পানির তালিকাভুক্তি এবং সুশাসন ও জবাবদিহি প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী প্রভাষক কাজী হোসাইন আলী কাজী।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) নেতারা অভিযোগ করেছেন, ২০১০ পরবর্তী সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহির বদলে জটিল বিধিমালা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাজারকে আরও সংকুচিত করা হয়েছে। তাদের দাবি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এর সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম খায়রুল হোসেন এর আমলে কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি।
পরবর্তী সময়ে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম-এর নেতৃত্বাধীন কমিশন নিয়েও ইনসাইডার ট্রেডিং, প্লেসমেন্ট বাণিজ্য ও বিতর্কিত আইপিও অনুমোদনের অভিযোগ ওঠে। বাজার সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই সময়গুলোতে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি ছিল প্রকট।
ফলে সাম্প্রতিক সময়ে চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ এর কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পরও কাঙ্খিত কাঠামোগত সংস্কার দৃশ্যমান হয়নি এমন সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট শেয়ারের মূল্য কার্যত শূন্যে নেমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা বড় ক্ষতির মুখে পড়েন। এ ঘটনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ডিবিএ নেতাদের ভাষ্য, গত ১৩-১৪ বছরে বাজারকে ‘ওলট-পালট’ করে দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, অসৎ কর্মকর্তা ও সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীদের যোগসাজশে বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে তারা সৎ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণের নামে আয়োজিত বিভিন্ন রোড শোর ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ এবং সম্ভাব্য রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় বা বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের অভিযোগ তদন্ত করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি তোলা হয়েছে। সংগঠনটি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে ৩০ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে।
এর মধ্যে রয়েছে: বিএসইসির দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের অপসারণ, চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠন, দুই স্টক এক্সচেঞ্জ, সিডিবিএল ও সিসিবিএলের পর্ষদ পুনর্গঠন এবং বিতর্কিত কিছু আইন-বিধি সংশোধন বা বাতিল। পাশাপাশি ভবিষ্যতে ফ্লোর প্রাইস আরোপ না করার নীতি, নতুন ট্রেক ইস্যুতে আর্থিক লেনদেন তদন্ত, আইপিও ও রাইট শেয়ারে স্বচ্ছতা জোরদার, দীর্ঘদিন বন্ধ কোম্পানি তালিকাচ্যুত করা এবং কারসাজির প্রমাণ মিললে ফৌজদারি মামলা দায়েরের বিধান প্রণয়নের দাবি জানানো হয়েছে।
বাজারে অনিয়মের চিত্র আরও স্পষ্ট হয় কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউসের ঘটনায়। প্রতারণামূলক সফটওয়্যার ও সমন্বিত গ্রাহক হিসাবের অপব্যবহারের মাধ্যমে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে শতকোটি টাকার ঘাটতি ধরা পড়ে। এর মধ্যে তামহা সিকিউরিটিজ লিমিটেড, বানকো সিকিউরিটিজ লিমিটেড, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ লিমিটেড এবং শাহ মোহাম্মদ সগির অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড-এর বিরুদ্ধে গ্রাহক অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠে।
তদন্তে কোথাও নগদ ও সিকিউরিটিজ মিলিয়ে ৬০-১৩০ কোটির বেশি ঘাটতি ধরা পড়ে। কিছু প্রতিষ্ঠানের ট্রেডিং কার্যক্রম স্থগিত করা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে এমন অভিযোগ রয়েছে। পুঁজি বাজার স্থিতিশীলকরণ তহবিল গঠনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারে সংঘটিত মোট ক্ষতির তুলনায় নিষ্পত্তিকৃত অর্থের পরিমাণ অতি সামান্য। তহবিলের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০২২ থেকে ২০২৪ সময়কালে মোট কয়েক কোটি টাকার নগদ ও স্টক ক্লেইম নিষ্পত্তি হয়েছে। কিন্তু বাজারে যে পরিমাণ লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, তার তুলনায় এই সহায়তা অপ্রতুল এমন সমালোচনা জোরালো।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, পুঁজিবাজার খুব শিগরিই ঘুরে দাঁড়াবে। এই দরপতন নিয়ে বিনিয়োগকারীদের শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এটা শেয়ারের মূল্য সংশোধন। কারণ একটানা ব্যাংক খাতের শেয়ারের দরবৃদ্ধির পর প্রফিট টেকিংয়ের কারণে দরপতন হচ্ছে।
এছাড়া দীর্ঘ দেড় যুগের অনিয়ম ও অব্যবস্থায় প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া পুঁজিবাজারে গত ১৭ মাসের বেশি সময় ধরে চলতে থাকা সংস্কারও স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে পারনি। বরং দেশের শিল্প ও সেবা খাতের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অর্থায়নের মাধ্যম হিসেবে পরিচিত এ খাতটি এ মুহূর্তে কিছু দ্রুত মুনাফালোভী মানুষের টাকা বানানোর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ফলে এখানে বিনিয়োগকারী দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগকারী কেউই পুঁজিবাজারে সুফল পাচ্ছেন না। এছাড়া সংস্কারের নানা পদক্ষেপ নেওয়ার পরও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরছে না।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কর্মকাণ্ডে হতাশ হয়ে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। তারা মনে করছেন নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ পুঁজিবাজারে সঠিক ভূমিকা রাখতে পারছে না। বাজার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মিলে শেয়ার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শুধু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দিয়ে পুঁজিবাজার স্থিতিশীল হবে না।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অন্তবর্তীকালীন সরকারের গত ১৭ মাসে পুঁজিবাজারে সংস্কারের নামে ধ্বংস করছে। বাজার সংস্কারে নানা পদক্ষেপের কথা জানানো হলেও বাস্তবে কোনো উন্নতির দেখা যায়নি। এই পরিস্থিতির কারণে বাজারে নতুন করে কেউ বিনিয়োগ করছে না। বাজারে থাকা বিদেশিরাও বিনিয়োগ কমাচ্ছে।



