বেক্সিমকো গ্রুপের ১০০ টাকার গ্রিন সুকুক বন্ড নেমেছে ৬২ টাকায়
আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বেক্সিমকো গ্রুপের ‘গ্রিন সুকুক’ বন্ডে বিনিয়োগ করা প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে বন্ডটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সময়মতো অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ১০০ টাকা অভিহিত মূল্েযর বন্ডটির বাজারদর এরই মধ্যে নেমে এসেছে ৬২ টাকায়। এতে ব্যাংকসহ প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের লোকসানে পড়েছেন।
বিশেষ করে যেসব ব্যাংক এই বন্ডে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে, তারা এখন চাপের মুখে। নির্ধারিত সময়ে অর্থ ফেরত না পেলে আমানতকারীদের দায় মেটাতে অতিরিক্ত তহবিল সংগ্রহের প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ সুরক্ষায় বন্ডের মেয়াদ বাড়ানো এবং বন্ডের অর্থে নির্মিত তিস্তা সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প বিক্রির আলোচনা শুরু হয়েছে।
এ ছাড়া ‘সিংকিং ফান্ড’ থেকে আংশিক অর্থ ফেরতের বিষয়টিও বিবেচনায় আছে। তবে এই তহবিল দিয়ে পুরো বিনিয়োগ ফেরত দেওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সিংকিং ফান্ড হলো এমন একটি তহবিল, যেখানে কোনো প্রতিষ্ঠান বা বন্ড ইস্যুকারী নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা রাখে ভবিষ্যতে ঋণ বা বন্ডের মূল টাকা পরিশোধ করার জন্য।
যেমন ধরা যাক একটি কোম্পানি ৫ বছরের জন্য বন্ড ছাড়ল। মেয়াদ শেষে একসাথে বড় অঙ্কের টাকা ফেরত দেওয়ার বদলে তারা প্রতি বছর কিছু টাকা আলাদা করে জমা রাখলো। এই জমাকৃত তহবিলই হলো সিংকিং ফান্ড। ‘বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক আল ইসতিসনা’ ছিল দেশের প্রথম বেসরকারি শরিয়াহভিত্তিক সুকুক বন্ড। ২০২১ সালে তিন হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়ে এটি বাজারে আনা হয়। বন্ডের অর্থ গাইবান্ধার তিস্তা ২০০ মেগাওয়াট ও করতোয়া ৩০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগের কথা ছিল।
তবে শুরু থেকেই এই বন্ডে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কম ছিল। কয়েক দফা সময় বাড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত সাড়া না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্যোগে ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়। সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার দাবি, অনেক ক্ষেত্রে এই বিনিয়োগ কার্যত বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়।
বাজার সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ব্রোকারেজ কোম্পানিগুলোকে মোট বিনিয়োগের ৩ শতাংশ বন্ডে বিনিয়োগের নির্দেশ দেয়। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর জন্য বিশেষ ছাড় দিয়ে এই বিনিয়োগকে ‘পুঁজিবাজার এক্সপোজারের’ বাইরে রাখার সুযোগ করে দেয়। ফলে ব্যাংকগুলো বড় অঙ্কের অর্থ এই বন্ডে বিনিয়োগ করে। বর্তমানে মোট বিনিয়োগের প্রায় ৭৫ শতাংশই এসেছে ২৭টি ব্যাংক থেকে।
তবে বিএসইসির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট বন্ডে বিনিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়নি। বন্ড অনুমোদনের আগে বেক্সিমকো লিমিটেডের মুনাফা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে কোম্পানিটি ৬৬০ কোটি টাকা মুনাফা দেখায়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৪ গুণ বেশি। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকায়। কিন্তু অনুমোদনের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কোম্পানিটি ৩৬ কোটি টাকা লোকসানের তথ্য দেয়।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই মুনাফার চিত্র বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ভূমিকা রেখেছিল। ২০২২ সালে বন্ডটি ইউনিটপ্রতি ৯৮ টাকায় কিনেছিল ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো। বর্তমানে সেটি নেমে এসেছে ৬২ টাকায়। ফলে যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো বন্ডটি ধরে রেখেছে, তারা বড় অঙ্কের লোকসানে রয়েছে। ২০২৪ সালের শুরুতেও বন্ডটির দাম ছিল ৮১ টাকা। সেই তুলনায় অল্প সময়েই মূল্য কমেছে প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এই বন্ড থেকে আয়ের প্রধান উৎস তিস্তা সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পটি থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ কোটি টাকা আয় হয়, যার মধ্যে ৭ থেকে ৮ কোটি টাকা পরিচালন ব্যয়ে খরচ হয়। বাকি অর্থ ট্রাস্টি হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্ত ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) ‘সিংকিং ফান্ডে’ জমা করছে। তবে এখন পর্যন্ত জমা হওয়া অর্থ দিয়ে পুরো বিনিয়োগ ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়। ধারণা করা হচ্ছে, বন্ডের মেয়াদ শেষে এই তহবিলে সর্বোচ্চ ৬০০-৬৫০ কোটি টাকা জমা হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বন্ডের মেয়াদ পাঁচ বছর বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। এ ক্ষেত্রে নতুন করে মুনাফার হার নির্ধারণ করতে হতে পারে, কারণ বাজারে সুদের হার ইতিমধ্যে বেড়েছে। অন্যদিকে, উপযুক্ত ক্রেতা পাওয়া গেলে তিস্তা সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প বিক্রি করেও বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার বিকল্প বিবেচনায় রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করেছে,
যা ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সুরক্ষায় করণীয় নির্ধারণে কাজ করছে। বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন সময়মতো পুরো অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে কি না। পাশাপাশি বাধ্যতামূলক বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের দায়ভার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অভিজ্ঞতা দেশের করপোরেট বন্ডবাজারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। আস্থার ঘাটতি তৈরি হলে ভবিষ্যতে নতুন বন্ডে বিনিয়োগ টানাও কঠিন হয়ে পড়বে।



