আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বছরের পর বছর চরম অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার শিকার দেশের পুঁজিবাজারে হঠাৎ আস্থা ও প্রত্যাশার ঝলকানি দিয়ে আবার যেন তা হাওয়ায়ই মিলে গেল। দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত পুঁজিবাজার নানামুখী বিতর্কের কারণে দীর্ঘ মন্দার মধ্য দিয়ে পার করে এলেও নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম কার্যদিবসে তার জানানও দিয়েছিলেন বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এখনো পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এতে নতুন করে আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।

সাধারণত সারা বিশ্বে কোনো নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির প্রথম আভাসটি আসে পুঁজিবাজার থেকে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম কার্যদিবসেও তেমনই ইঙ্গিত ছিল দেশের পুঁজিবাজারের আগামী দিনের পথ চলার। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার সাথে বাজারের বাস্তবতা ভিন্ন আচরণ করছে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে ভুগতে থাকা বিনিয়োগকারীরা পুঁজিাবাজর নিয়ে নতুন সরকারের কার্যকর উদ্যোগ দেখতে উন্মুখ হয়ে আছেন। তবে বিএসইসি চেয়ারম্যানের পরিবর্তন ইস্যুতে দোঁটানায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এক্ষেত্রে সরকারের ভুমিকা অস্পষ্ট।

বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুঁজিবাজারের মূল সমস্যা সমাধানে নজর নেই কারও। যখন যিনি চেয়ারে বসেন, তখন তিনি নিজের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। বছরের পর বছর পুঁজিবাজারে ভালো কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। যেসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে, সেগুলোর মান ও স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে। কিন্তু পুঁজিবাজারের সংকট দূর হচ্ছে না কেন? এভাবে কি পুঁজিবাজারে অস্থিরতা চলতেই থাকবে?

পুঁজিবাজারে টানা দরপতনের ঘটনাকে অস্বাভাবিক বলছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। বাজার যে ধরনের আচরণ করছে, সেটিকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলা যাবে না। কারণ বাজার আজ ভাল তো কাল খারাপ। এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

এদিকে পুঁজিবাজারকে দীর্ঘদিনের সৃষ্ট অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা থেকে মুক্ত করে সাধারণের আস্থা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাজারের সাথে জড়িত স্টেক হোল্ডারদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করা, এমনটিই মনে করেন পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অতীতে এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন না থাকায় অনেক মূল্য দিতে হয়েছে দেশের অর্থনীতির এ প্রধান খাতটিকে। বারবার বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়েছে পুঁজিবাজারের লাখ লাখ বিনিয়োগকারীকে। বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়েছে ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

১৯৯৬ সালের প্রথম বিপর্যয়ের পর পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে সময় নেয় এক যুগেরও বেশি। আর ঘুরে দাঁড়ানোর পর বছর অতিক্রান্ত না হতেই আবারো বিপর্যয়ের মুখে পড়ে দেশের পুঁজিবাজার। ২০১০ সালে আরো ভয়াবহ বিপর্যয়ের শিকার হয় পুঁজিবাজার। দুইবারই একটি নির্দিষ্ট দলের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমেই ঘটে এ বিপর্যয়। কিন্তু দুইবারই বিপর্যয়ের কারণ খতিয়ে দেখতে কমিশনের মাধ্যমে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হলেও কোনোবারই জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা হয়নি।

উপরন্তু এক যুগেরও বেশি সময় সেই সরকারের নিয়োগ পাওয়া কমিশনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় অসংখ্য নামসর্বস্ব ও মৌলভিত্তিহীন কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে এক দিকে বিনিয়োগকারীদের পকেট কাটা হয়েছে, অন্য দিকে এসব কোম্পানির উদ্যোক্তাদের পকেট ভারী করা হয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থারও একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটও সক্রিয় বলে জানা যায়, যারা পরিকল্পিতভাবে তখনকার সরকার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজার লুট করার সব মাল-মসলা জোগান দিয়েছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার খোন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে বর্তমান কমিশনকে দায়িত্ব দেয়। কিন্তু পেশায় ব্যাংকার মাকসুদ বিএসইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আস্থায় নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। আগের দুই কমিশনের সময় অভ্যন্তরীণ একটি সিন্ডিকেটের অসহযোগিতায় শুরু থেকে কমিশন দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তিতে অর্থমন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার সাথে জড়িত কিছু ব্যক্তিতে শাস্তির আওতায় আনা গেলে পরিস্থিতি কমিশনের অনুকূলে আসে।

কিন্তু কমিশন তার মেয়াদে আগের মেয়াদের নানা অনিয়মের শাস্তিস্বরূপ জরিমানা এবং নীতি সংস্কারের ওপর বেশি জোর দেয়ার চেষ্টা করলেও পুঁজিবাজারের মূল কাজটি করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। আঠার মাস দায়িত্ব পালন করলেও একটি কোম্পানিকেও পুঁজিবাজারে আনতে পারেনি কমিশন। এ ছাড়া কমিশনের নানা কর্মকাণ্ড বাজারের স্টেক হোল্ডারদের একটি অংশকে নিজেদের আস্থায় আনতে ব্যর্থ হয়েছে।

এখন নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন বিভাগে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। তাই বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকার চাইলে নিজেদের পছন্দের কাউকে নিয়োগ দিতেই পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে দরকার পুঁজিবাজার বিষয়ে অভিজ্ঞ এবং স্টেক হোল্ডারদের সাথে সমম্বয়ের মাধ্যমে বাজারকে গতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব হিসাবে গড়ে তুলতে পারে। নিশ্চিত করতে পারে এর অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও সুশাসন।

এ প্রসঙ্গে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও বিশিষ্ট পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ড. মোহাম্মদ মুসা বলেন, পুঁজিবাজারকে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আনতে এ মুহূর্তে সবচাইতে বেশি দরকার এ অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করা। সরকার চাইলে তাদের পছন্দের কাউকে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় নিয়োগ দিতেই পারে। কিন্তু এটা নিশ্চিত করতে হবে দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সাথে যাতে তার দায়িত্ব পালন করতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সরকারি আমলা বা একাডেমিক কাউকে হতেই হবে এটা তেমন জরুরি নয়। পুঁজিবাজারের সাথে ঘনিষ্ঠ কাউকেও এ ক্ষেত্রে নিয়োগ দেয়া যায় যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। তা ছাড়া সবচেয়ে যেটা বেশি প্রয়োজন তা হলো পুঁজিবাজারের সাথে সংশ্লিষ্ট সব স্টেক হোল্ডারের মধ্যে প্রয়োজনীয় সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।