আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা:  অবশেষে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে অপসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে পুঁজিবাজার নিয়ে আশার সঞ্চার তৈরী হয়েছে। ফলে সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের উত্থানে লেনদেন শেষ হয়েছে।

তবে একটি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি আর্থিকখাত। বিশেষ করে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার। জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ব্যাংকিং খাতে নানামুখী সংস্কার ও পদক্ষেপের মাধ্যমে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হলেও আর্থিকখাতের আরেক চালিকাশক্তি পুঁজিবাজারে বিপরীত অবস্থা বিরাজমান।

ক্রমান্বয়ে পুঁজিবাজার ডুবতে বসেছে। স্পর্শকাতর এই খাতটির সঙ্গে লাখ লাখ বিনিয়োগকারীদের সরাসরি বিনিয়োগ জড়িত, প্রতিদিনের লেনদেনের প্রতিফলন ঘটে সূচক উঠা-নামার মাধ্যমে, ফলে বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়াটিও সূচকের সমান্তরাল রেখায় প্রতিফলিত হয়।

অবশ্য এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ শীর্ষ ব্যক্তিদের খামখেয়ালীপনা, বাজার সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব, নানা হঠকারী সিদ্বান্ত, ব্যক্তিগত অভিপ্রয়াস, পুঁজিবাজারের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গকে অবমূল্যায়ন,

কমিশনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নতুন মিউচুয়্যাল ফান্ড বিধিমালা-২০২৫ ও মার্জিন রুলের মতো আত্মঘাতি সিদ্বান্ত বাস্তবায়ন, আইপিও খরা, পুঁজিবাজারের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিদেরকে অবমূল্যায়ন এবং একটি স্বার্থান্বেষী কুচক্রি মহল দ্বারা প্রভাবিত হওয়াসহ নানাবিধ কারণে দেশের পুঁজিবাজার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

এছাড়া দেশের শিল্পায়নের গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় না পৌঁছানোর পেছনে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ঘাটতি অন্যতম বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও সম্প্রসারণে বিপুল মূলধনের প্রয়োজন হলেও দেশের অর্থায়ন কাঠামো এখনো মূলত ব্যাংকনির্ভর। উচ্চ সুদের চাপ, ঋণ পরিশোধের সময়সীমা এবং আর্থিক ঝুঁকি অনেক উদ্যোক্তার জন্য বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।

ফলে শিল্পখাতের সম্প্রসারণ কাঙ্খিত গতিতে এগোতে পারে না। রাশেদ মাকসুদ দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের পুঁজিবাজারে নজিরবিহীন স্থবিরতা বিরাজ করছে। গত ১৯ মাসে কোনো নতুন কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি। এমনকি এ সময়ে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) অনুমোদনের জন্যও কোনো আবেদন জমা পড়েনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিতে।

জানা গেছে, চেয়ার আঁকড়ে ধরে রাখার অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন পুঁজিবাজারের চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। তাকে সরানোর চূড়ান্ত পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। তবে তাকে এ পদ থেকে সরানোর আগে কমিশন আইনে কিছু পরিবর্তন আনা হবে। এরইমধ্যে আইন পরিবর্তনের কার্যক্রম শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিদ্যমান আইনে চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৬৫ বছর নির্ধারিত থাকলেও তা কমিয়ে ৬০ বছর করার চিন্তাভাবনা চলছে। একইসঙ্গে কমিশনারদের ক্ষেত্রেও একই সীমা প্রযোজ্য করার প্রস্তাব রয়েছে। এ লক্ষ্যে আইন সংশোধনের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। শুধু পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাই নয়, বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এর ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে সংস্থাটির চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বয়সসীমা ৬৭ বছর থাকলেও তা কমিয়ে ৬০ বছরে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আইন সংশোধনের পরই বর্তমান চেয়ারম্যানকে অপসারণ করে নতুন নেতৃত্ব আনা হবে। একইসঙ্গে কমিশনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদেও পরিবর্তন আসতে পারে। বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাতেও নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্ব দিয়ে কার্যক্রম চলছে।
পুঁজিবাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতা এবং বিনিয়োগকারীদের অসন্তোষও এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাজারে দরপতনের প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি উঠে আসছিল।

নীতিনির্ধারকদের মতে, আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোতে কাঠামোগত সংস্কার আনা এখন সময়ের দাবি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন আনা হয়েছে, এবং একই ধারাবাহিকতায় পুঁজিবাজার ও বিমা খাতেও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন সংশোধন চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে না। আলোচনার ভিত্তিতে বয়সসীমা ও অন্যান্য বিষয় কিছুটা পরিবর্তিতও হতে পারে। সার্বিকভাবে এই উদ্যোগকে পুঁজিবাজারকে আরও স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।