স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স পিএলসি বীমা আইন, শ্রম আইন ও আন্তর্জাতিক হিসাব মান (আইএএস) পরিপালনে ব্যর্থ হচ্ছে। কোম্পানিটির সর্বশেষ ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২৫ হিসাব বছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য। এতে কোম্পানিটি একদিকে আইন লঙ্ঘন করছে, অন্যদিকে কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার থেকেও বঞ্চিত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স কর্তৃপক্ষ এখনো ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড (ডব্লিউপিপিএফ) গঠন করেনি। যদিও ২০০৬ সালের শ্রম আইনের ২৩২ ধারা অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ডব্লিউপিপিএফ গঠন করা এবং মুনাফা অর্জনের পরবর্তী ৯ মাসের মধ্যে কর্মীদের মধ্যে তা বিতরণ বাধ্যতামূলক।

এ বিষয়ে আর্থিক বিবরণীতে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করেছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে শ্রম আইন কার্যকর হবে কি না, সে বিষয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়ের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি)। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) আবেদন জানিয়েছে। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে বীমা খাতে ডব্লিউপিপিএফ প্রযোজ্য নয়— এমন কোনো নির্দেশনা আসেনি। তাই ফান্ড গঠন করেনি কোম্পানিটি।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোম্পানির জমি বাবদ সম্পদের মূল্য দেখানো হয়েছে ৩২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, যা সর্বশেষ ২০১৯ সালে পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছিল। অথচ আন্তর্জাতিক হিসাব মান (আইএএস)-১৬-এর ধারা ৩৪ অনুযায়ী, প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছর অন্তর সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন আবশ্যক। নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হলেও পুনর্মূল্যায়ন না করায় হিসাব মান লঙ্ঘন হয়েছে।

বীমা কোম্পানি আইন ২০১০ অনুযায়ী, নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার ধারণের হার কমপক্ষে ৬০ শতাংশ হতে হবে। কিন্তু প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সে উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার রয়েছে মাত্র ৪৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ, যা আইন পরিপালনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি নির্দেশ করে।

নিরীক্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, আন্তর্জাতিক হিসাব মান (আইএএস), ১৯-এর ধারা ৫৫-৫৬ অনুযায়ী গ্র্যাচুইটি ফান্ডের দায় নির্ধারণে অ্যাকচুয়ারিয়াল মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়নি। ফলে গ্র্যাচুইটি-সংক্রান্ত সঞ্চিতির পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া কোম্পানি কর্মচারীদের গ্র্যাচুইটি সুবিধা দেওয়া হলেও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নীতিমালা গ্রহণ করা হয়নি এবং গ্র্যাচুইটির জন্য পৃথক হিসাবও সংরক্ষণ করা হচ্ছে না।

সব অনিয়মের মধ্যেই সমাপ্ত ২০২৫ অর্থবছরে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ। আলোচ্য বছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছে ২ দশমিক ১৯ টাকা এবং গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়ায় ২৮ দশমিক ১৬ টাকায়। ২০০৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের পরিশোধিত মূলধন ৪০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৫১ দশমিক ৫২ শতাংশ মালিকানা রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে।