তাকাফুল ইসলামী ইন্সুরেন্সের এমডির বিরুদ্ধে শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বীমা খাতে চলছে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং অর্থ আত্মসাতের মহোৎসব! আর এইসব অপকর্মের পেছনে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর নিস্কিয়তা ও দুর্বলতাকে। সম্প্রতি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদপ্তরের (এনএসআই) একটি প্রতিবেদনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ফলে দেশে জীবন বীমা ও সাধারণ বীমা খাতের নতুন এবং পুরনো কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা খরচের নামে চলছে তলে তলে লুটপাট।
ফলে দুরবস্থার যেন শেষ নেই। বীমা খাতে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা খরচে জটিলতা বিরাজ করছে। সম্প্রতি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স পিএলসির গ্রাহকের আমানতের শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। খোদ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) বিরুদ্ধে ওঠা এই বিশাল অঙ্কের অনিয়ম খতিয়ে দেখতে এবার নড়েচড়ে বসেছে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স পিএলসির এমডি আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে গত ১২ বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ, ভ্যাট ফাঁকি, গোপন ব্যাংক হিসাব পরিচালনা ও বীমা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ তদন্তে জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি কোম্পানিটির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের পক্ষে আসমা নাজনীন আইডিআরএর চেয়ারম্যানের কাছে এ অভিযোগ করেন। অভিযোগপত্রের অনুলিপি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যানের কাছেও পাঠানো হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্যের সহযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানিটিতে নানা আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। এতে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির লোকাল অফিস শাখায় একাধিক ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, এসব হিসাবের মাধ্যমে গত ১২ বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। পুনর্বীমা কমিশনের অর্থ থেকেও অতিরিক্ত কমিশন দেখিয়ে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, কোম্পানির অর্থ বিভিন্ন ব্যক্তির নামে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) হিসেবে রাখা হলেও সেগুলোর তথ্য বার্ষিক আর্থিক হিসাব বিবরণীতে দেখানো হয়নি। পরে এসব আমানত নগদায়নের মাধ্যমে অর্থ বণ্টনের অভিযোগও তোলা হয়েছে। ব্যবসা সংগ্রহের নামে অতিরিক্ত কমিশন দেখিয়েও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়, গত ১২ বছরে প্রায় ৮১ কোটি টাকা কমিশন পরিশোধ দেখানো হলেও এর একটি অংশ অন্য হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে।
কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকৃত প্রিমিয়াম আদায়ের তুলনায় কম ভ্যাট পরিশোধ করা হয়েছে। বিষয়টি গোপন রাখতে গত ১২ বছরে প্রায় ৩২ কোটি টাকা অবৈধ সুবিধা দিতে ব্যয়ের অভিযোগ করা হয়। এ ছাড়া কোম্পানির ব্যাংক হিসাব থেকে প্রায় ১১ কোটি টাকা তাকাফুল ইসলামী সিকিউরিটিজ লিমিটেডকে ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়। এর মধ্যে অন্তত ২ কোটি টাকা বিভিন্ন খাতে ব্যয় দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি। একটি চেকের প্রাপকের নাম পরিবর্তন করে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের আর্থিক বিবরণীর বিভিন্ন খাতেও অস্বাভাবিক অগ্রিম ব্যয়ের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে অভিযোগে। এর মধ্যে অফিস ডেকোরেশন বাবদ প্রায় ২ কোটি ৬১ লাখ টাকা, বেতনের বিপরীতে ৮ কোটি ১৮ লাখ টাকা, মোটরসাইকেল কেনার নামে প্রায় ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা এবং ইনসেনটিভ বোনাস হিসেবে প্রায় ৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা অগ্রিম দেখানো হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব ব্যয়ের বিপরীতে যথাযথ কাগজপত্র ও বাস্তব কাজের প্রমাণ নেই।
অভিযোগে আরও বলা হয়, কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর নয় এবং বীমা আইন, ২০১০-এর বিভিন্ন ধারা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। এতে কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
এ বিষয়ে তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, কর্তৃপক্ষ তদন্ত করলে আমি জবাব দেব। এর বেশি কিছু বলব না। এ বিষয়ে আইডিআরএর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, ইতোমধ্যে এই অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। গত ২-৩ মাস কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদটি শূন্য থাকায় কাজে ধীরগতি ছিল। তবে সংশ্লিষ্ট বিভাগ অভিযোগটি নিয়ে কাজ শুরু করেছে।
মুলত তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ২০০৮ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটি বর্তমানে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। কোম্পানির মোট শেয়ারের ৪৮.৯৩ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ১৯.৩৯ শতাংশ শেয়ার।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে দশমিক ০৬ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৩১.৬২ শতাংশ শেয়ার। ৪২ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানিটির মোট শেয়ারসংখ্যা ৪ কোটি ২৫ লাখ ৮৬ হাজার ৯৭৭টি। গতকাল সর্বশেষ শেয়ারটির লেনদেন হয়েছে ৩৩ টাকা ৭০ পয়সায়।



