স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: সাম্প্রতিক সময়ে মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিধিমালা পরিপালনে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কঠোর অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি ইতোমধ্যে ক্লোজড-এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ডের সব ট্রাস্টিকে ক্লোজড-এন্ড স্কিমগুলোর অবসায়ন অথবা ওপেন-এন্ড ফান্ডে রূপান্তর সংক্রান্ত সদ্য প্রণীত মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিধিমালা কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই আস্থার সংকট চলছে। এই সংকটের অন্যতম বড় কারণ মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের অনীহা। বছরের পর বছর ধরে অধিকাংশ ফান্ডের ইউনিট অভিহিত মূল্য (ফেস ভ্যালু) থেকে নিচে লেনদেন হচ্ছে, যা সামগ্রিক বাজারের জন্য ইতিবাচক নয়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।

জানা গেছে, গত ৯ জুন বিএসইসির ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের কর্মকর্তা মো. আতিকুল্লাহ খান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিধিমালা, ২০২৫-এর বিধি ৬২(২) অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। গত বছরের নভেম্বরে কার্যকর হওয়া সংশোধিত মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিধিমালা অনুসারে, কোনো ক্লোজড-এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ড যদি তার নেট অ্যাসেট ভ্যালুর (এনএভি) (ছয় মাসের চলমান গড়ের ভিত্তিতে গণনা করা) ২৪ শতাংশের বেশি ডিসকাউন্টে ট্রেড করে, তবে ফান্ডটিকে আইনত একটি ওপেন-এন্ডেড কাঠামোতে রূপান্তরিত হতে হবে অথবা অবসায়ন করতে হবে।

আদেশটি ক্লোজড-এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ড পরিচালনাকারী ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এসব ট্রাস্টির মধ্যে রয়েছে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি), বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড (বিজিআইসি) এবং গ্রামীণ ফান্ড। যেহেতু ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ড এবং গণনার সময়সীমা ১২ মে শেষ হয়েছে, তাই অ্যাসেট ম্যানেজার ও ট্রাস্টিরা এখন অবিলম্বে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিতে আইনগতভাবে বাধ্য। এ রূপান্তর কার্যকর করার জন্য বিএসইসি বিস্তারিত নির্দেশনাও দিয়েছে।

অন্যদিকে, এই ফান্ড অবসায়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে বিনিয়োগকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টরস অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির দাবি, বিগত মাকসুদ কমিশন মিউচ্যুয়াল ফান্ড, মার্জিন রুলস ও আইপিও-সংক্রান্ত ‘কালো আইন’ প্রণয়নের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে।

তাদের ভাষ্য, নতুন বিধিমালার আওতায় বিদ্যমান মেয়াদি মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোকে অবসায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে আনা হতে পারে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নামবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাও আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হাজার হাজার কর্মী কর্মহীন হয়ে পড়তে পারেন। তাদের মতে, নতুন বিধিমালায় অনেকটা বাধ্যতামূলকভাবেই অবসায়নের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সংগঠনটির দাবি, আইনে বলা হয়েছে দুই-তৃতীয়াংশ ইউনিটধারীর ভোটে মেয়াদি ফান্ডগুলোর রূপান্তর বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। কিন্তু যারা ফান্ডগুলো বহাল রাখার পক্ষে মত দেবেন, তাদের জন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের মতামত উপেক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি তারা আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়তে পারেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম ইকবাল হোসেন বলেন, মিউচ্যুয়াল ফান্ড অবসায়নের বিরুদ্ধে আমি মহামান্য আদালতে রিট করেছি এবং আদালত রুল জারি করেছেন। বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন। তাই মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মিউচ্যুয়াল ফান্ড অবসায়ন প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার দাবি জানাচ্ছি।

তবে মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকারী অন্য একটি অংশের দাবি, একটি স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের স্বার্থে বিনিয়োগকারীদের একটি সংগঠনকে ব্যবহার করে নতুন বিধিমালা বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে। তাদের মতে, বিএসইসিকে এ বিষয়ে আরও কঠোর নজরদারি করতে হবে। তারা বিশ্বাস করেন, বিধিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন হলে মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।

এ বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. আবুল কালাম বলেন, বিএসইসি বিধিমালা পরিপালনের বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ইতোমধ্যে একটি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এখানে মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, বিএসইসি ধাপে ধাপে একটি সময়সূচি নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা ট্রাস্টিদের অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে। ছয় মাসের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে ট্রাস্টিদের একটি রেকর্ড ডেট ঘোষণা করতে হবে। এ তথ্য দুটি জাতীয় দৈনিক (একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি), একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে মূল্য সংবেদনশীল তথ্য (পিএসআই) হিসেবে প্রকাশ করতে হবে। নোটিশের সময়কাল হতে হবে ১৪ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে।

রেকর্ড ডেট ঘোষণার পর থেকে স্টক এক্সচেঞ্জে সংশ্লিষ্ট ফান্ডের ইউনিট লেনদেন স্থগিত থাকবে। রেকর্ড ডেটের ২১ দিনের মধ্যে একটি বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) আয়োজন করতে হবে। রূপান্তর অনুমোদনের জন্য নিবন্ধিত ইউনিটধারীদের মোট ইউনিটের তিন-চতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন প্রয়োজন হবে। ইউনিটধারীরা রূপান্তরের পক্ষে ভোট দিলে ট্রাস্টিকে ৯০ দিনের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

তবে কোনো ফান্ড যদি এনএভি-ডিসকাউন্ট ধারার আওতায় পড়ে এবং বিশেষ সাধারণ সভায় ইউনিটধারীরা রূপান্তর অনুমোদন না করেন, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাধ্যতামূলক অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে। রূপান্তর প্রক্রিয়ার আর্থিক চাপ কমাতে বিএসইসি মোট রূপান্তর ও ইউনিট ইস্যু ব্যয় ফান্ডের আকারের ১ শতাংশে সীমাবদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে অ্যাসেট ম্যানেজারের ফি নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। এছাড়া নতুন রূপান্তরিত ওপেন-এন্ড স্কিমগুলোর নিবন্ধন ফি সম্পূর্ণ মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাত শক্তিশালী না হলে দেশের পুঁজিবাজার কখনোই স্থিতিশীল হতে পারবে না। উন্নত বিশ্বে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সরাসরি শেয়ারে বিনিয়োগ না করে পেশাদার ফান্ড ম্যানেজারদের মাধ্যমে বিনিয়োগ করে থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশে সুশাসনের অভাব, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন অনিয়মের কারণে এ খাত প্রত্যাশিত উন্নতি করতে পারেনি। তাদের মতে, মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোর প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ার কথা ছিল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলো। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে বেশ কিছু ফান্ডের ট্রাস্টি, কাস্টডিয়ান ও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিএসইসির জন্য এই কঠোর অবস্থান ধরে রাখা এবং সফলভাবে বাস্তবায়ন করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের আশঙ্কা, কমিশনের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে যাতে নজরদারি শিথিল না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানগুলোর ফান্ড ব্যবস্থাপনা দক্ষতার আধুনিকায়ন জরুরি। পাশাপাশি মিউচ্যুয়াল ফান্ড যে একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম, সে বিষয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

বিএসইসির এই কঠোর অবস্থান পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কমিশন যদি সফলভাবে মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে, তবে তা দেশের পুঁজিবাজারের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।