আলী রেজা ইস্যুতে ইস্টার্ন ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলার হুঁশিয়ারি
বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: অনিয়ম-দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাৎ এবং মানি লন্ডারিংয়ের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি (ইবিএল) সাবেক এমডি ও সিইও আলী রেজা ইফতেখারের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানে তথ্য দিতে টালবাহানা করছেন ইবিএলের কর্মকর্তারা। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কয়েক দফা তাগিদ দিলেও প্রতিবারই সময় চেয়ে আবেদন করেছেন ইবিএল কর্মকর্তারা। আলী রেজা ইফতেখারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান চলছে। প্রয়োজনীয় নথি দিতে বারবার সময় চাইলেও এখনো তথ্য দেয়নি ইস্টার্ন ব্যাংক (ইবিএল)।
অনুসন্ধানে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ইবিএলের বর্তমান এমডিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে দুদক। ফলে অনুসন্ধানকাজে অসহযোগিতা ও বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করার হুঁশিয়ারির বার্তা দিয়েছেন দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা। অবিলম্বে তথ্য-উপাত্ত না পাওয়া গেলে কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে ইবিএলের বর্তমান এমডি ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করা হতে পারে।
গত ৩ মার্চ ড. মোমেন কমিশন পদত্যাগ করায় দুদকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বন্ধ রয়েছে। শিগগিরই কমিশন পুনর্গঠন হতে পারে। নতুন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পরই বিষয়টি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে। ঋণ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফতের বিরুদ্ধে গত বছরের ১৩ এপ্রিল মামলা করে দুদক। সেই মামলার তদন্তের একপর্যায়ে আলী রেজা ইফতেখারের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে সম্প্রতি তার বিরুদ্ধেও আলাদা করে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় দুদকের উপপরিচালক মো: মোস্তাফিজুর রহমানকে। তিনি অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে আলী রেজা ইফতেখারের বিষয়ে ৬ রকমের নথিপত্র চেয়ে গত ৩ মে ইস্টার্ন ব্যাংকের কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেন। চিঠিতে ইস্টার্ন ব্যাংকে থাকা আলী রেজা ইফতেখারের ব্যক্তিগত নথির সত্যায়িত কপি,
জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের কপি, মোবাইল ও টেলিফোন নম্বরসহ বর্তমান এবং স্থায়ী ঠিকানা, গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বেতন-ভাতার সমুদয় হিসাব বিবরণী, তার নামে পরিচালিত সব ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য (চালু ও বন্ধ) এবং এ পর্যন্ত তাকে দেওয়া অবসরকালীন সুবিধাসহ সব আর্থিক লেনদেনের নথিপত্র চাওয়া হয়।
নথি সরবরাহের জন্য ইস্টার্ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে ১৭ মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে ইস্টার্ন ব্যাংক নথি সরবরাহে ব্যর্থ হয়। নির্ধারিত সময়ের শেষ দিনে আরও ১০ কর্মদিবস সময় চেয়ে দুদকে আবেদন করে ইস্টার্ন ব্যাংক। সার্বিক বিবেচনায় ৭ কর্মদিবস সময় মঞ্জুর করেন দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা। সে অনুসারে ৩ জুনের মধ্যে সব নথি দুদকে জমা দেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু সেই সময়ের মধ্যেও নথিপত্র সরবরাহ করেনি ইবিএল। উপরন্তু আরও ৩ মাস সময় চেয়ে ৪ জুন আবেদন করেন ইবিএলের ডিএমডি মাহমুদুন নবী চৌধুরী ও হেড অব এএমএলডি মো. শাহজাহান আলী। এই আবেদনে ক্ষুব্ধ দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান গত ৮ জুন ইবিএলের এমডিকে কড়া ভাষায় নোটিশ দেন। নোটিশে ১৮ জুনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সব নথি সরবাহের চূড়ান্ত বার্তা দেওয়া হয়।
অন্যথায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুদক আইনের ১৯(৩) ধারায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ার করা হয়। চূড়ান্ত বার্তার পরেও কোনো নথি সরবরাহ করেনি ইবিএল কর্তৃপক্ষ। ফলে ইবিএলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার প্রস্তুতি নিচ্ছেন দুদক কর্মকর্তারা।
দুদক আইনের ১৯(৩) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তা-কর্মচারী দুদকের অনুসন্ধান বা তদন্তের কাজে বাধা দিলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে নির্দেশ অমান্য করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই অপরাধের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা কর্মকর্তা-কর্মচারী সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
মুলত ২০০৪ সালে আলী রেজা ইফতেখার ইবিএলের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৬ সালে পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন। ২০০৭ সালে তিনি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিযুক্ত হন। চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল তিনি অবসরে যান। বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি কোনো ব্যাংকেই কোনো এমডি এত দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। দীর্ঘ সময়ে অন্তত ৫ বার তাকে এমডি পদে পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয়।
আলী রেজা ইফতেখার ২০১২ সালে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়ান লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ‘সিইও অব দ্য ইয়ার-২০১২’ পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০২০-২১ এবং ২০১৪-১৫ মেয়াদে দেশের ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।



