দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণ আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৭৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও একই সময়ে নিবন্ধিত মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমেছে, তবুও সক্রিয় বিনিয়োগকারীদের বড় অঙ্কের লেনদেনের কারণে মোবাইলভিত্তিক ট্রেডিংয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি এসেছে।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে মোট ১৬ হাজার ৯২ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মোবাইলভিত্তিক লেনদেন প্রায় ৭৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে মোট বাজার লেনদেনে মোবাইল অ্যাপের অংশও ১৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

তবে এই প্রবৃদ্ধির বিপরীতে নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। আগের অর্থবছরে যেখানে মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ২৬ হাজার ৬৭ জন, সেখানে সর্বশেষ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৩১৩ জনে। অর্থাৎ ব্যবহারকারী প্রায় ৩৭ শতাংশ কমলেও লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কমসংখ্যক হলেও অধিক সক্রিয় এবং বড় বিনিয়োগকারী মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বেশি পরিমাণে লেনদেন করায় এমন চিত্র দেখা গেছে।

সামগ্রিকভাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরটি পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক ছিল। এ সময়ে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ১৯ দশমিক ১১ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৭৬৩ পয়েন্টে পৌঁছেছে। একই সময়ে ব্লু-চিপ সূচক ডিএস-৩০ প্রায় ২০ শতাংশ এবং শরিয়াহভিত্তিক সূচক ডিএসইএস ১০ দশমিক ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাজার মূলধনেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। জুন শেষে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মোট বাজার মূলধন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময় ছিল ৬ লাখ ৬২ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। ফলে এক বছরে বাজার মূলধন প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

লেনদেনের দিক থেকেও ছিল উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডিএসইতে মোট লেনদেনের মূল্য ৫৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৭২ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। পুরো অর্থবছরে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল প্রায় ৭২২ কোটি টাকা। মূল বাজারের পাশাপাশি ব্লক মার্কেটেও লেনদেন বেড়ে ৭ হাজার ১২৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও বেড়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে বিদেশিদের মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা। তবে মোট লেনদেন বাড়লেও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এ সময়ে শেয়ার কেনার তুলনায় বিক্রি করেছেন বেশি।

বাজারে লেনদেন বৃদ্ধির ইতিবাচক প্রভাব সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপরও পড়েছে। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৩৭ অনুযায়ী ডিএসইর টার্নওভারের বিপরীতে সরকারের কোষাগারে ১০৪ কোটিরও বেশি টাকা কর জমা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, স্মার্টফোনের বিস্তার, উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং ঘরে বসেই নিরাপদে লেনদেনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মোবাইল অ্যাপের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। একই সঙ্গে আধুনিক ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম, দ্রুত অর্ডার সম্পাদন এবং তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়ার সুবিধা ডিজিটাল লেনদেনকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

তাদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে দেশের পুঁজিবাজারকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও গতিশীল করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, ব্যবহারবান্ধব প্ল্যাটফর্ম উন্নয়ন এবং নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য ডিজিটাল ট্রেডিং বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।