শহীদুল ইসলাম, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে নতুন করে আশার সঞ্চার হচ্ছে। আস্থাহীন ও অনিশ্চয়তার কারণে গতিহীন হয়ে পড়া পুঁজিবাজারে ভালো মৌল ভিত্তি শেয়ারে ভর করে গতি ফেরার আভাস মিলছে। তেমনি নতুন অর্থবছরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশা জাগিয়েছে পুঁজিবাজার। কারণ সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরটি শেষ হয়েছে সূচক ও লেনদেন উভয় ক্ষেত্রেই শক্ত অবস্থানে।  গত ৩০ জুন প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স দাঁড়ায় ৫ হাজার ৭৬৩ পয়েন্টে, যা গত প্রায় ২১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সূচকটি সর্বশেষ ৫ হাজার ৭৭৮ পয়েন্টে উঠেছিল। ফলে দীর্ঘ মন্দা আর অনিশ্চয়তার পর পুঁজিবাজার আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

কারণ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট চূড়ান্ত করার সময় সরকার পুঁজিবাজারের জন্য একগুচ্ছ কর-প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। ব্যক্তি ও কোম্পানির লভ্যাংশ আয়ের ওপর কর কমানো, মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সীমা তুলে দেওয়া, তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য অতিরিক্ত কর ছাড়, জিরো কুপন বন্ডের আয় করমুক্ত রাখা এসব পদক্ষেপকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে বড় কর-সহায়তা হিসেবে দেখছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও স্পষ্ট করে বলেছেন, দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন কমিয়ে একটি শক্তিশালী ও গভীর পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে হবে। ফলে সবার মাঝে একটাই প্রশ্ন এবার কী সত্যি পুঁজিবাজার চাঙা হচ্ছে। ফলে পুঁজিবাজারে সূচক ও লেনদেনের বড় উত্থানে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আবারও আস্থা ফিরে আসতে শুরু করেছে। টানা কয়েক মাস ধুঁকতে থাকা বাজারে হঠাৎ সূচকের উল্লম্ফন ও লেনদেনের মাত্রা বাড়ায় অনেকেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন।

ডিএসইর ব্রোকারেজ হাউসগুলোর মালিকদের সংগঠন ডিবিএর সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, নতুন অর্থবছরে পুঁজিবাজার ঘিরে আমরা অত্যন্ত আশাবাদী। আমাদের এই আশাবাদ তৈরি করেছে বাজার নিয়ে সরকারের কাঠামোগত পরিকল্পনা এবং সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গৃহীত নানা পদক্ষেপ। সরকার ব্যাংক নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারকে অর্থনীতির মূল স্রোতে নিয়ে আসতে আন্তরিক।

এ ছাড়া বাজারের স্বার্থে আমরা যেসব দাবি ও পরামর্শ দিয়েছি, সরকার সেগুলোও আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করছে। তাই সব মিলিয়ে বাজার নিয়ে আমাদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হলো ভালো শেয়ারের ঘাটতি এবং খারাপ শেয়ারের আধিক্য। আমরা মনে করি, সরকার দ্রুত ভালো শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিলে এই দুশ্চিন্তার অনেকটাই কেটে যাবে।

ফলে সপ্তাহজুড়ে দেশের পুঁজিবাজারে সূচকের উত্থানের মধ্য দিয়ে লেনদেন হয়েছে। মুলত গত সপ্তাহে চার কার্যদিবসের মধ্যে তিন কার্যদিবস সূচকের উত্থানে লেনদেন শেষ হয়েছে। এছাড়া টানা ছয় কার্যদিবস ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের কারেকশনে লেনদেন শেষ হয়েছে। এতে সপ্তাহ ব্যবধানে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) বাজার মূলধন বেড়েছে ৫ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। পুঁজিবাজারের সাপ্তাহিক হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

এতে সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসের লেনদেন শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯৭ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা। যা আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ছিল ৬ লাখ ৯২ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে বাজার মূলধন বেড়েছে ৫ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। বাজার মূলধন বাড়ার পাশাপাশি গত সপ্তাহে প্রধান মূল্য সূচকেরও উত্থান হয়েছে। ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স সপ্তাহজুড়ে বেড়েছে ৯১ দশমিক শূন্য ৪ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৬১ শতাংশ। আগের সপ্তাহে সূচকটি কমে ৮ দশমিক ৫৬ পয়েন্ট বা দশমিক ১৫ শতাংশ।

অপর দুই সূচকের মধ্যে ইসলামী শরিয়াহ ভিত্তিতে পরিচালিত কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই শরিয়াহ্ সূচক গত সপ্তাহজুড়ে বেড়েছে ২৫ দশমিক ২৮ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ২১ শতাংশ। আগের সপ্তাহে সূচটি কমে ৬ দশমিক ৮২ পয়েন্ট বা দশমিক ৫৯ শতাংশ। আর বাছাই করা ভালো কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক গত সপ্তাহজুড়ে বেড়েছে ৩০ দশমিক ৮৫ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আগের সপ্তাহে সূচকটি কমে ১১ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট বা দশমিক ৫৬ শতাংশ।

এদিকে গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেনের গতিও বেড়েছে। সপ্তাহের প্রতি কার্যদিবসে ডিএসইতে গড়ে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৪৩৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। আগের সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয় ৯৫১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কার্যদিবসে গড় লেনদেন বেড়েছে ৪৮২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা বা ৫০ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

এদিকে সপ্তাহ ব্যবধানে দেশের অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই ও সিএসসিএক্স যথাক্রমে ১.৭০ শতাংশ ও ১.৮৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৪০৭.৭৭ পয়েন্টে ও ৯৪৩৬.৬৯ পয়েন্টে। এছাড়া সিএসই-৩০ সূচক ১.৪২ শতাংশ ও সিএসই-৫০ ১.২৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১৩৯৬৫.৬১ পয়েন্টে ও ১১১০.১৯ পয়েন্টে। আর সিএসআই সূচক বেড়েছে ২.৪৬ শতাংশ। সূচকটি অবস্থান করছে ৮৬৩.০৭ পয়েন্টে।

চলতি সপ্তাহজুড়ে সিএসইতে লেনদেন হয়েছে ১৭১ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা এর আগের সপ্তাহে ছিল ৩৬০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। সপ্তাহ ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ১৮৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। সপ্তাহজুড়ে সিএসইতে ৩২৯টি কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ২১১টির, কমেছে ৮৯টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২৯টির কোম্পানির শেয়ার দর।