পুঁজিবাজারে ফিরছে গতি, আশার মাঝেও সতর্কতার বার্তা
দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: নতুন অর্থবছরের শুরুতে দেশের পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সূচকের ধারাবাহিক উত্থান ও লেনদেনের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এবং বাজার সংস্কারে সরকারের নানা উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশাবাদ তৈরি করেছে। তবে একই সঙ্গে ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির সংকট, দুর্বল প্রতিষ্ঠানের আধিক্য এবং সম্ভাব্য কারসাজির ঝুঁকি বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও বাড়াচ্ছে। ফলে বাজারে স্থায়ী আস্থা ফিরিয়ে আনতে কেবল সূচক বাড়াই নয়, বরং কাঠামোগত সংস্কার ও কার্যকর তদারকির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এমন এক অবস্থানে প্রবেশ করছে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী সূচক ও লেনদেনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত ২ জুলাই লেনদেন শেষে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স দাঁড়ায় ৫ হাজার ৭৪৩ পয়েন্টে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সূচকটি ৫ হাজার ৭৭৮ পয়েন্টে উঠেছিল। শুধু সূচক নয়, বাজারে লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
৩০ জুন ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা, যা প্রায় ২৮ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর পর ২ জুলাই ডিএসইতে ১ হাজার ৪৩৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি লেনদেন ১ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। এক বছর আগের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে পরিবর্তনটি আরও স্পষ্ট।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসইএক্স ছিল ৪ হাজার ৮৬৫ পয়েন্ট এবং লেনদেন ছিল মাত্র ৪৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সূচক বেড়েছে প্রায় ৯০০ পয়েন্ট এবং দৈনিক লেনদেন তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই উন্নতির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করছে। নতুন নেতৃত্বে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কার্যক্রম শুরু হওয়া, পুঁজিবাজার উন্নয়নে সরকারের নীতিগত আগ্রহ, নতুন অর্থবছরের বাজেটে দেওয়া বিভিন্ন প্রণোদনা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অর্থনীতিতে ব্যাংক নির্ভর অর্থায়নের বিকল্প হিসেবে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার বিষয়ে সরকারের ইতিবাচক অবস্থান ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। বাজারে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, করপোরেট অর্থায়ন সহজ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ধারাবাহিক নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন হবে। তবে ইতিবাচক প্রবণতার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জও সামনে রয়েছে।
বিশেষ করে ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় বাজারে বিনিয়োগের বিকল্প সীমিত। অন্যদিকে দুর্বল বা কার্যক্রম বন্ধ থাকা কিছু কোম্পানির শেয়ারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং কারসাজির প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অতীতেও বাজারে এমন পরিস্থিতি বহু ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীকে আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে টেকসই স্থিতিশীলতা আনতে নতুন ও লাভজনক কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুঁজিবাজারে অন্তর্ভুক্তি বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি করবে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য মানসম্পন্ন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বা কার্যক্রমহীন কোম্পানিগুলোর বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াও জরুরি।
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, বাজারে ভালো কোম্পানির সরবরাহ বাড়ানো এবং অকার্যকর বা বন্ধ কোম্পানিগুলোকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ চলছে। এ লক্ষ্যে সরকারি লাভজনক কিছু প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি তালিকাভুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
পাশাপাশি যেসব কোম্পানির শেয়ারের দামে অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্তও সেই তদারকির অংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পুঁজিবাজারে সূচক ও লেনদেনের ঊর্ধ্বগতি অবশ্যই ইতিবাচক সংকেত। তবে এই প্রবণতা তখনই দীর্ঘস্থায়ী হবে, যখন বাজারে সুশাসন নিশ্চিত হবে ও কারসাজি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য মানসম্পন্ন কোম্পানির সংখ্যা বাড়বে।
অন্যথায় সাময়িক উচ্ছ্বাস দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী আস্থায় রূপ নাও নিতে পারে। সব মিলিয়ে নতুন অর্থবছরের শুরুতে দেশের পুঁজিবাজার আশাব্যঞ্জক অবস্থানে থাকলেও এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে কার্যকর সংস্কার, কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং মানসম্পন্ন কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়ানোই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের পুঁজিবাজার অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী অর্থায়নের উৎস হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।



