দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য কার্যকর হলো নবম জাতীয় পে-স্কেল। তবে নতুন বেতন কাঠামো চালু হলেও বাড়তি বেতন কবে থেকে ব্যাংক হিসাবে জমা হবে, তা নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এখনো রয়েছে নানা প্রশ্ন। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, গেজেট প্রকাশ এবং হিসাব সমন্বয়ের ওপরই নির্ভর করছে বর্ধিত বেতন পাওয়ার সময়।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে একই বেতন কাঠামোর অধীনে থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয়

বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। সেই বাস্তবতায় নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের দশম থেকে ২০তম গ্রেডের বেতন-ভাতায় কোনো কাটছাঁট হচ্ছে না। জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশই চূড়ান্ত করেছে সচিব কমিটি। তবে নবম থেকে প্রথম গ্রেডের চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে কমিশনের সুপারিশে কাটছাঁট হতে পারে। এই কাটছাঁটের পরিমাণ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে জুলাই থেকেই বাস্তবায়ন শুরু হবে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নতুন জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশকৃত কাঠামোতেই দশম থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিজীবীদের বেতন নির্ধারণের সুপারিশ করেছে সচিব কমিটি। ফলে তাদের ক্ষেত্রে কোনো কাটছাঁট করা হবে না। তবে প্রথম থেকে নবম গ্রেডের ক্ষেত্রে সচিব কমিটির সুপারিশে পরিবর্তন আসতে পারে, যা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, দশম গ্রেডে বেতন ১৬ হাজার থেকে ৩২ হাজার টাকা, ১১তম গ্রেডে ১২ হাজার ৫০০ থেকে ২৫ হাজার টাকা, ১২তম গ্রেডে ১১ হাজার ৩০০ থেকে ২৪ হাজার ৩০০ টাকা, ১৩তম গ্রেডে ১১ হাজার থেকে ২৪ হাজার টাকা, ১৪তম গ্রেডে ১০ হাজার ২০০ থেকে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা, ১৫তম গ্রেডে ৯ হাজার ৭০০ থেকে ২২ হাজার ৮০০ টাকা, ১৬তম গ্রেডে ৯ হাজার ৩০০ থেকে ২১ হাজার ৯০০ টাকা, ১৭তম গ্রেডে ৯ হাজার থেকে ২১ হাজার ১০০ টাকা, ১৮তম গ্রেডে ৮ হাজার ৮০০ থেকে ২১ হাজার টাকা, ১৯তম গ্রেডে ৮ হাজার ৫০০ থেকে ২০ হাজার ৫০০ টাকা এবং ২০তম গ্রেডে ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, প্রথম থেকে নবম গ্রেড পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধি জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী হবে না। এই সুপারিশের ওপর সচিব কমিটি কাটছাঁট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে কী পরিমাণ কাটছাঁট করা হবে, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে কাটছাঁট যে হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ধাপ বা প্রথম গ্রেডে বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। দ্বিতীয় গ্রেডে বর্তমানে মূল বেতন ৬৬ হাজার টাকা, যা বাড়িয়ে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

একইভাবে তৃতীয় গ্রেডে ৫৫ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা, চতুর্থ গ্রেডে ৫০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকা, পঞ্চম গ্রেডে ৪৩ হাজার টাকা থেকে ৮৬ হাজার টাকা, ষষ্ঠ গ্রেডে ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৭১ হাজার টাকা, সপ্তম গ্রেডে ২৯ হাজার টাকা থেকে ৫৮ হাজার টাকা, অষ্টম গ্রেডে ২৩ হাজার টাকা থেকে ৪৭ হাজার ২০০ টাকা এবং নবম গ্রেডে ২২ হাজার টাকা থেকে ৪৫ হাজার ১০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বেতন অংশের শতভাগ প্রথম ধাপেই কার্যকর করা হবে এবং অন্যান্য ভাতা দ্বিতীয় ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। নতুন বেতন কাঠামো আগামী জুলাই থেকেই কার্যকর হবে বলে জানা গেছে। গত ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। অর্থবছরের শুরু অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নবম বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের কথা বলেন তিনি।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারি কর্মচারীরা বিগত প্রায় ১১ বছর ধরে একই বেতন কাঠামোতে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিচ্ছি।
সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন গত ২২ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন জমা দেয়।

নবম বেতন কমিশনের সুপারিশ জমা দেওয়ার সময় কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খান জানিয়েছিলেন, প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে বাড়তি ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। তবে সরকার এই সুপারিশ পর্যালোচনা ও কাটছাঁটের জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। এ কমিটি তিন ধাপে বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে।

প্রস্তাবিত বাজেট আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। কিন্তু নতুন পে-স্কেলের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে কোনো দৃশ্যমান বরাদ্দ নেই। তবে সরকার এরই মধ্যে নীতিগতভাবে ১ জুলাই থেকেই পে-স্কেলের একটি অংশ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর তা বাস্তবায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বাড়তি ৫৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই বরাদ্দ থেকে অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা বেতন অংশে স্থানান্তর করা হবে বলে বাজেট বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন কাঠামোর ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন শুরু হবে। তবে বেতন অংশ প্রথম ধাপেই শতভাগ দেওয়া হবে, যদিও জাতীয় বেতন কমিশনের মূল সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে না। একইভাবে জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনীর পে-কমিশনও একই পদ্ধতিতে একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রতি বছরের বাজেটের ‘বিবরণী-২খ’-এ পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়।

সেখানে কর্মকর্তা বেতন, কর্মচারী বেতন ও ভাতাদি এই তিন খাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ বরাদ্দ ছিল ৮৫ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দ বেড়েছে ৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। একইভাবে ‘বিবরণী-৪’-এ পরিচালন ব্যয়ের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ৮৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ৮৪ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকার তুলনায় ৪ হাজার ৬৪১ কোটি টাকা বেশি।

তবে আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের বরাদ্দ রাখা হয়েছে বাজেট সংক্ষিপ্তসারের ‘বিবরণী-২ক’-এ। সেখানে ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে আগামী অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ৮৬ হাজার ৮৬২ কোটি টাকার তুলনায় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত এ বরাদ্দের মধ্যে অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও পেনশন ভোগীদের নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য রাখা হয়েছে।