পুঁজিবাজারে জুলাইতে ২ হাজার কোটি টাকা লেনদেনের আভাস
শহীদুল ইসলাম, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দীর্ঘদিনের মন্দা ও আস্থার সঙ্কট কাটিয়ে জুলাইয়ে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে স্বস্তি ফিরে আসা, মুদ্রাস্ফীতি কমার সম্ভাবনা এবং তুলনামূলক কম মূল্যায়নের কারণে পুঁজিবাজারে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। এছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট চূড়ান্ত করার সময় সরকার পুঁজিবাজারের জন্য একগুচ্ছ কর-প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। ব্যক্তি ও কোম্পানির লভ্যাংশ আয়ের ওপর কর কমানো, মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সীমা তুলে দেওয়া, তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য অতিরিক্ত কর ছাড়, জিরো কুপন বন্ডের আয় করমুক্ত রাখা এসব পদক্ষেপকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে বড় কর-সহায়তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া চলতি অর্থবছরের শেষ কার্যদিবস লেনদেন বেড়ে ২০২৪ সালের আগস্টের পর বা প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে। তেমনি জুলাইতে পুঁজিবাজারে ২ হাজার কোটির লেনদেন আভাস দেখা যাচ্ছে।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, পুঁজিবাজারে কারসাজির মাধ্যমে মানুষের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এমনকি অনেকে সর্বস্ব হারিয়ে আত্মহত্যা পর্যন্ত করেছে। তাই পুঁজিবাজারে সুশাসন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। ফলে পুঁজিবাজার ইস্যুতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও স্পষ্ট করে বলেছেন, দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন কমিয়ে একটি শক্তিশালী ও গভীর পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ সহজ করতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসব ইতিবাচক উদ্যোগের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে এবার কি সত্যিই পুঁজিবাজার চাঙা হবে? নাকি অতীতের মতো এই আশাও বাস্তবতার মুখে ফিকে হয়ে যাবে?
ফলে পুঁজিবাজার গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে আস্থার সংকটে ভুগছে।
একসময় ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাংক খাতের অনিয়ম, পুঁজিবাজার কারসাজি এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণের কারণে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হয়েছে। সে সময় অনেকের বিশ্বাস ছিল, সরকার পরিবর্তন হলেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
পরবর্তীকালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একই ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং লেনদেন কমেছে, নতুন বিনিয়োগকারী আসেননি এবং সূচকের ওঠানামাও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেনি। এখন নির্বাচিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও বাজারে কাঙ্খিত গতি না ফেরায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে সমস্যা কি শুধু সরকারের, নাকি পুঁজিবাজারের সংকট আরও গভীরে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসই এক সদস্য বলেন, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে পুঁজিবাজার নিয়ে আশাবাদ সৃষ্টি হতে দেখছেন। নিস্কিয় বিনিয়োগকারীরা ফের বাজারে ফিরছেন। পুঁজিবাজার নিয়ে বর্তমান সরকারের ইতিবাচক মনোভাবই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরায় গত দুই বছরের মধ্যে সব্বোর্চ লেনদেন হয়েছে।
এছাড়া বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী পরিষ্কার করেছিলেন, তাঁর সরকার পুঁজিবাজারকে ব্যবহার করে অর্থনীতি গড়তে চায়। বাজেট পাসের সময়ও তিনি বিনিয়োগকারীদের চাহিদা মেনে কিছু পরিবর্তন এনেছেন। বিশেষত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মূলধনি মুনাফায় করহার বাড়ানোর প্রস্তাব ফিরিয়ে নিয়েছেন। এ পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীরা পছন্দ করেছেন। ফলে বাজারের এ ধারা চলমান থাকলে জুলাইতে লেনদেন ২ হাজার কোটি টাকা ছাড়াবো।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ধারাবাহিকভাবে লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং প্রধান সূচকগুলোর ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ার পাশাপাশি মৌলভিত্তিক ও বড় মূলধনি শেয়ারে ক্রয়চাপ অব্যাহত থাকায় বাজারে ইতিবাচক গতি বজায় রয়েছে। তবে এ প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে লেনদেনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, নতুন বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং বাজারে স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এছাড়া বাজারে লেনদেন ২ থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন তারা।



