বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের বড় অংশের মূল্য হারিয়ে তীব্র আর্থিক সংকটে পড়েছে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। ব্যাংকঋণের বিপরীতে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার সুদ পরিশোধ করতে না পেরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির বিপরীতে নেওয়া ৩ হাজার কোটি টাকার তহবিলের গ্যারান্টির মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়াতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

আইসিবির তথ্য অনুযায়ী, সরকার, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থে পুঁজিবাজারে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। তবে সেই বিনিয়োগের বর্তমান বাজারমূল্য নেমে এসেছে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ বিনিয়োগের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মূল্য হারিয়েছে। আর ক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে হিসাব করলে পোর্টফোলিওতে ইরোশন দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা।

গত ১১ জুন আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির মেয়াদ ১৩ মার্চ ২০২৬ থেকে ১২ মার্চ ২০২৯ পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন জানানো হয়। ২০২৪ সালে দেওয়া ১৮ মাসের রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির মেয়াদ গত ১৫ মে শেষ হয়েছে।

চিঠিতে আইসিবি বলেছে, সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রত্যাশা অনুযায়ী উচ্চ সুদে বিপুল পরিমাণ অর্থ ধার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু দীর্ঘদিনের বাজার মন্দায় শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় এবং সুদ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আইসিবির আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল এখনই পরিশোধ করতে হলে বিপুল পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করতে হবে। এতে পুঁজিবাজারে বিক্রির চাপ তৈরি হবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে বাজারে গতি ফিরলে মূলধনী মুনাফা, লভ্যাংশ ও অন্যান্য আয় বাড়বে এবং অনার্জিত (আনরিয়ালাইজড) ক্ষতির বড় অংশ কাটিয়ে উঠে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি হবে বলে মনে করছে আইসিবি।

আর্থিক সংকট থেকে উত্তরণে মূলধন পুনর্গঠন, রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর ঋণকে শেয়ারে রূপান্তরের পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের মতে, এতে সুদ ব্যয়ের চাপ কমবে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

আইসিবির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বিনিয়োগ থেকে মূলধনী মুনাফা, লভ্যাংশ এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে যে আয় হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে সুদ পরিশোধে। এর সঙ্গে পরিচালন ব্যয় ও বিনিয়োগের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বড় লোকসানে পড়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে আইসিবি রেকর্ড ১ হাজার ২১৩ কোটি টাকা লোকসান করে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেও লোকসান হয়েছে ৫৮৮ কোটি টাকা। অর্থবছরের শেষ তিন মাসের হিসাব এখনো প্রকাশ হয়নি। তবে শেষ প্রান্তিকেও লোকসান হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আইসিবির মতে, উচ্চ সুদের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করা গেলে শেয়ার লেনদেন ও লভ্যাংশ আয় থেকেই প্রতিষ্ঠানটি আবার মুনাফায় ফিরতে পারবে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং সরকার থেকে ১ হাজার কোটি টাকা সহায়তা পেয়েছে আইসিবি। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া ৩ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকা উচ্চ সুদের ঋণ পরিশোধে এবং ১ হাজার কোটি টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা হয়েছে। সরকারের দেওয়া ১ হাজার কোটি টাকাও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা হয়েছে।

আইসিবি জানিয়েছে, ২ হাজার কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ করায় বছরে প্রায় ৪৬৫ কোটি টাকা সুদ ব্যয় সাশ্রয় হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ মনিটরিংয়ের মাধ্যমে ‘এ’ ক্যাটাগরির শেয়ারে বিনিয়োগ করা ১ হাজার কোটি টাকা থেকে ভালো মূলধনী মুনাফা ও লভ্যাংশ আয় হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদনের পর অর্থ বিভাগের সরকারি ঋণ ও আর্থিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ গ্যারান্টি ফি হিসেবে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ হারে সাড়ে ৭ কোটি টাকা জমা দিতে বলে। আইসিবি ইতোমধ্যে সেই অর্থ পরিশোধ করেছে।

আইসিবির কর্মকর্তারা জানান, অতীতে তহবিল ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও বর্তমান পর্ষদ পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনায় নজরদারি বাড়িয়েছে। ব্লক মার্কেট থেকে শেয়ার কেনা বন্ধ করা হয়েছে। পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিদিন পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং প্রতি ১৫ দিন পরপর তা পরিচালনা পর্ষদে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইসিবির এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, অতীতে পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনায় যে ফাঁকফোকর ছিল, তা এখন অনেকটাই বন্ধ করা হয়েছে। ফলে নতুন করে পোর্টফোলিওর ক্ষয় কমেছে। তবে আগের ক্ষতির প্রভাব এখনো বহন করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, আইসিবির বার্ষিক পরিচালন ব্যয় প্রায় ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা হলেও সুদ পরিশোধেই বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। তাই স্বল্প সুদে ঋণ পুনঃঅর্থায়ন বা রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ঋণ শেয়ারে রূপান্তর করা গেলে প্রতিষ্ঠানটির ওপর চাপ অনেক কমবে। তার ভাষ্য, বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা সুদ ওভারডিউ রয়েছে। অর্থের অভাবে তা পরিশোধ করা যাচ্ছে না। ফলে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোকে এ অর্থের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হচ্ছে, যা তাদের আর্থিক হিসাবেও প্রভাব ফেলছে। সরকার ঋণের বিপরীতে শেয়ার ইস্যুর অনুমতি দিলে আইসিবির সুদ ব্যয় কমবে এবং বিদ্যমান পোর্টফোলিও থেকেই প্রতিষ্ঠানটি আবারও মুনাফায় ফিরতে পারবে।

আইসিবির বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণ ছিল ২ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা। তখন ক্রয়মূল্যে পোর্টফোলিওর আকার ছিল ১ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা এবং বাজারমূল্য ছিল ৩ হাজার ১৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাজারমূল্যে ১ হাজার ৫০৯ কোটি টাকার উদ্বৃত্ত ছিল।

অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আইসিবির মোট ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ২৯৪ কোটি টাকায়। একই সময়ে ক্রয়মূল্যে পোর্টফোলিওর আকার দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। কিন্তু বাজারমূল্য নেমে এসেছে ৮ হাজার ৬০৮ কোটি টাকায়। ফলে পোর্টফোলিওতে ইরোশন দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা।

ব্যাংকঋণের সুদহার বৃদ্ধির কারণে একসময় আইসিবির সুদ ব্যয়ও দ্রুত বেড়েছিল। ২০১০-১১ অর্থবছরে সুদ ব্যয় ছিল ১৮৪ কোটি টাকা, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে বেড়ে ১ হাজার ১৫১ কোটি টাকায় ওঠে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল দিয়ে ২ হাজার কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ করায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সুদ ব্যয় কমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

৮ এর পাতা ৩ কলাম