দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শুধু একজন রাজনীতিক হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে। তিনি একজন আলেম। ধর্মীয় চর্চা, শাসনক্ষমতা, ইসলামবিরোধীদের বিপক্ষে শক্ত অবস্থান মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী নেতায় পরিণত করেছে তাকে। বিশেষ করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তার একক অবস্থান তাকে অনন্য একটি অবস্থানে নিয়ে গেছে। আয়াতুল্লাহ খামেনি ১৯৩৯ সালের ১৭ জুলাই ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন খ্যাতনামা আলেম আয়াতুল্লাহ সৈয়েদ জাওয়াদ খামেনি।

আয়তুল্লাহ খামেনি নিজেকে হোসাইনী সাইয়েদ বলে দাবি করেছেন, যার অর্থ তিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রাঃ)-এর বংশধর। যদিও আধুনিক ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে এর প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। তবুও ইসলামী ঐতিহ্য ও বংশ তালিকার ভিত্তিতে তার এই পরিচয় মুসলিম বিশ্বে তার ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করেছে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে ইরান সরকার-প্রকাশিত জীবনী ও কিছু ঐতিহাসিক সূত্র মতে, খামেনি হলেন হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ৩৮তম বংশধর। শিয়া সম্প্রদায়ে ‘সাইয়্যেদ’ উপাধি মূলত এই বংশগত পরিচয়ের স্বীকৃতি বহন করে। যদিও এই দাবি ধর্মীয় বংশতালিকা ও ঐতিহ্যগত উৎসের ওপর নির্ভর করে তৈরি, তবুও আধুনিক কোনও বৈজ্ঞানিক যাচাই আজ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। তবে মুসলিম বিশ্বে এটি একটি প্রতীকী মর্যাদা বহন করে।

রেডিও ফারডা ডটকম, উইকিপিডিয়াসহ বিভিন্ন সাইটের তথ্য বলছে, খামেনি পরিবার বা খামেনেই রাজবংশ হলো ইরানি আজেরি সাইয়্যিদ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। যারা নিজেদেরকে ইসলামের চতুর্থ ইমাম আলী ইবনে হুসেন জয়ন আল-আবিদিনের বংশধর বলে দাবি করে। খামেনির বংশধারা অনুসারে, তার পূর্বপুরুষদের আবাসস্থল আজারবাইজান, বর্তমান ইরান, নাজাফ, তাফরেশ ইত্যাদি অঞ্চলে ছিল।

খামেনির রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয় ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে। তিনি ছিলেন ইমাম রুহুল্লাহ খোমেনির ঘনিষ্ঠ সহচর ও বিপ্লবের অন্যতম মুখ। বিপ্লবের পর তিনি ইরানের প্রথম আলেম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। পরে ১৯৮৯ সালে ইমাম খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন, এবং আজও সেই পদে অধিষ্ঠিত আছেন।

যদিও তিনি শিয়া আলেম, তবুও খামেনির ভাষণ ও দৃষ্টিভঙ্গিতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতি গুরুত্ব বারবার উঠে এসেছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, শিয়া-সুন্নি বিভেদ ইসলাম বিরোধী ষড়যন্ত্র। ২০১০ সালে ইসলামী ঐক্য সম্মেলনে তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে মিল বেশি, ফারাক নয়। শত্রুরা চায় বিভাজন। তিনি প্রায়শই সূরা আল ইমরান-এর ১০৩ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করেন: তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জু দৃঢ় ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না।

খামেনি বহুবার সৌদি আরব, মিশর, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন সুন্নি দেশের আলেমদের সঙ্গে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন। আল-আলম, প্রেস টিভি এবং তেহরান টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকে সমর্থন জানিয়ে বলেন আজ ফিলিস্তিনকে রক্ষা মানে ইসলামকে রক্ষা করা। ২০১৪ সালে গাজার ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসনের সময় তিনি প্রকাশ্যে হামাসসহ প্রতিরোধ যোদ্ধাদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন।

এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছয় দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায় অনুষ্ঠান গত শনিবার থেকে তেহরানে শুরু হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনেই মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ৮৬ বছর বয়সী এই নেতা তার পরিবারের চার সদস্যসহ নিহত হন। যুদ্ধের কারণে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শুরু হওয়া এই শোকানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ইরানের রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সে বিপুল মানুষের সমাগম ঘটে।

কালো পোশাক পরিহিত এবং শিয়া ইসলামের ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রতীকী রক্ত-লাল পতাকা হাতে অংশগ্রহণকারীরা ‘আমেরিকা ধ্বংস হোক’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগানে পুরো এলাকা মুখর করে তোলেন বলে জানানো হয়। ইরানি সংবাদমাধ্যমের বরাতে বলা হয়, এই আয়োজনের উদ্দেশ্য হলো দেশটির ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, বিপ্লবী আদর্শ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি রাজনৈতিক অবস্থান প্রদর্শন করা।

কফিন পৌঁছানোর আগেই মোসাল্লা প্রাঙ্গণে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন। দীর্ঘ ৩৭ বছর দেশ শাসন করা এই নেতার মৃত্যুতে শোকাহত মানুষ কান্না, বুক চাপড়ানো এবং আবেগপূর্ণ প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে শোক প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানে খামেনির পাশাপাশি তার পরিবারের সদস্যদের ছবি এবং তার ছেলে ও সম্ভাব্য উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির ছবি সংবলিত পোস্টারও প্রদর্শিত হয়।