চট্টগ্রাম প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ: সীতাকুণ্ডের সাগরপাড়ের জাহাজভাঙা শিল্প দাঁড়িয়ে আছে লাশের ওপর। সেখানে ১৩ বছরে ১৬১ জন মানুষ সংখ্যা হয়ে গেছে। মুছে গেছে নাম, হারিয়ে গেছে শরীর। প্রতিটি মৃত্যুর পর প্রতিবারই কয়েক দিন হইচই হয়েছে, তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণের। কিন্তু কিছুই আর হয়নি এরপর।

গত শুক্রবার সেখানে আবারও এক দিনেই ঝরে পড়ল ৯টি তাজা প্রাণ। আর তার পরদিন প্রকাশ পেল আরও নির্মম তথ্য দুর্ঘটনাটি ঘটেছে একটি ‘গ্রিন সার্টিফায়েড’ ইয়ার্ডে! অথচ সেখানেই তো প্রাণের নিরাপত্তা সবচেয়ে বেশি থাকার কথা। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠছে, এই গ্রিন সনদ আসলে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কতটুকু দিতে পারে।

ফলে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলের বিস্তীর্ণ সীমানায় দৈত্যাকার সব জাহাজ কাটার শব্দ আর আগুনের স্ফুলিঙ্গ প্রতিদিনের চেনা দৃশ্য। স্ক্র্যাপ লোহা জোগানের মাধ্যমে এই শিল্প দেশের নির্মাণ খাতের অন্যতম চালিকাশক্তি হলেও এর আড়ালে প্রতিনিয়ত পুড়ছে শ্রমিকের জীবন।

একের পর এক বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে যখন মরদেহ বের হয়ে আসে, তখন সামনে আসে একটি পুরোনো প্রশ্ন–জাহাজে আগুন বা গ্যাসকাটার ব্যবহারের আগে ‘গ্যাসমুক্ত’ সনদ কীভাবে নেওয়া হয়েছিল? সরেজমিনে অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট মহলের তথ্যে স্পষ্ট, কঠোর নজরদারির অভাবে বিস্ফোরক ও গ্যাসমুক্তির ছাড়পত্র এখন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কাগুজে প্রক্রিয়ায় রূপ নিয়েছে, যা সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা সৈকতকে রূপ দিচ্ছে এক বিপজ্জনক মৃত্যুফাঁদে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, স্ক্র্যাপ জাহাজ সমুদ্রসৈকতের ইয়ার্ডে ভেড়ার পর কাটিং প্রক্রিয়া শুরুর প্রধান পূর্বশর্ত হলো ‘গ্যাস ফ্রি ফর হট ওয়ার্ক’ বা উত্তপ্ত কাজের উপযোগী সনদপত্র নেওয়া। নিয়ম অনুযায়ী, জাহাজের ফুয়েল ট্যাংক, ইঞ্জিন রুম, পাম্প রুম এবং আবদ্ধ জায়গাগুলো থেকে দাহ্য গ্যাস, বিষাক্ত বাষ্প ও তেলের অবশিষ্টাংশ পুরোপুরি নিষ্কাশন করা হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট রাসায়নিক পরীক্ষক ও বিস্ফোরক পরিদর্শকের সশরীরে পরীক্ষা করার কথা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এই পরীক্ষা বাস্তবে নামমাত্র হয়ে থাকে বা একেবারে অনুপস্থিত।

বহু ইয়ার্ডে বিশেষ ড্রাফটের পুরোনো ট্যাংকারের তলদেশে জমে থাকা ঘন হাইড্রোকার্বন ও স্লাজ পুরোপুরি পরিষ্কার না করেই দ্রুত ভাঙা শুরু করে দেওয়া হয়। আর যখনই সেখানে গ্যাসকাটার বা ওয়েল্ডিং টর্চের আগুন লাগে, তখনই জমে থাকা বদ্ধ গ্যাস ভয়াবহ রূপ নিয়ে বিস্ফোরিত হয়। ফলে বিস্ফোরক অধিদপ্তর কিংবা অনুমোদিত পরীক্ষকদের দেওয়া এই ‘নিরাপদ’ সনদের বৈধতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে।

জাহাজভাঙা শিল্পের সামগ্রিক কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে রয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই), বিস্ফোরক অধিদপ্তর এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ সেল। কিন্তু বাস্তবে এই দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের চরম অভাব বিদ্যমান।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোর আয়তনের তুলনায় সরকারি তদারককারী সংস্থার জনবল অপ্রতুল। নিয়মিতভাবে প্রতিটি জাহাজের ভেতরের প্রতিটি চেম্বার সরেজমিনে তদারকি করার মতো প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বা সময় পরিদর্শকদের থাকে না বললেই চলে। অনেক সময় বেসরকারি পরীক্ষকদের দেওয়া প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে সরকারি দপ্তরগুলো। ফলে ইয়ার্ড মালিকদের প্রভাব ও কাটিং দ্রুত শেষ করার তাগিদে নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটি কার্যত অফিসের ফাইল চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। দুর্ঘটনা ঘটার পর তদন্ত কমিটি গঠন ও কিছু সময়ের জন্য কাজ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া ছাড়া দৃশ্যমান কোনো দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার নজরদারিতে আসে না।

জাহাজভাঙা কার্যক্রমে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ার পেছনে বড় একটি কারণ হিসেবে কাজ করছে অনিয়ন্ত্রিত ঠিকাদারি বা সাব-কন্ট্রাক্ট প্রথা। ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ সরাসরি স্থায়ী শ্রমিক নিয়োগের চেয়ে তৃতীয় পক্ষের ঠিকাদারদের মাধ্যমে দৈনিক মজুরিভিত্তিতে শ্রমিক নিয়ে কাজ করায় বেশি আগ্রহী।

আর ওই ঠিকা শ্রমিকদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ থাকে না। জাহাজের কোন অংশে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড, মিথেন বা কার্বন মনোক্সাইডের মতো গ্যাসের ঝুঁকি রয়েছে, সে বিষয়ে তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞাত থাকেন। উপযুক্ত রেসপিরেটরি মাস্ক, অগ্নিপ্রতিরোধী পোশাক কিংবা আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই কেবল সাধারণ সুতি কাপড় ও চটিজুতা পরে শ্রমিকদের গভীর ট্যাংকে নামিয়ে দেওয়া হয়। কাজের পরিবেশ যে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ, তা বুঝতে পারার আগেই যেকোনো আকস্মিক আগুনের শিখা তাদের জন্য নিশ্চিত মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়।

আন্তর্জাতিক শ্রম ও পরিবেশ সংস্থাগুলোর চাপের মুখে বাংলাদেশ হংকং কনভেনশন অনুস্বাক্ষর করেছে। কাগুজে নীতিমালায় ‘গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং’ এবং শ্রমিক নিরাপত্তার বহু ধারার উল্লেখ থাকলেও সীতাকুণ্ডের হাতেগোনা কয়েকটি ইয়ার্ড বাদে বাকিগুলোর অবকাঠামোগত পরিবর্তন অত্যন্ত ধীরগতির। তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ইমপারভিয়াস ফ্লোরিং এবং আধুনিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা অধিকাংশ ইয়ার্ডেই নামমাত্র।

তাই দুর্ঘটনা ঘটলে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার মতো ন্যূনতম আধুনিক সুবিধাও এই ইয়ার্ডগুলোতে মেলে না। গুরুতর দগ্ধ শ্রমিকদের নিয়ে ছুটতে হয় দূরবর্তী চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘শ্রমিকের অসাবধানতা’ কিংবা ‘অপ্রত্যাশিত গ্যাস নিঃসরণ’-কে কারণ হিসেবে দেখিয়ে ইয়ার্ডের মূল মালিকদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের অঙ্কও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত নগণ্য। অনেক পরিবারকে আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার ভয় দেখিয়ে নামমাত্র আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে আপস করতে বাধ্য করা হয়। মালিকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি দায় নির্ধারণ বা তদারকি কর্মকর্তাদের অবহেলার বিচার না হওয়ায় এই মৃত্যুচক্র থামছে না।

সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্প দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল সরবরাহ করছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই অগ্রগতির মূল্য যদি দিতে হয় শ্রমিকের লাশের বিনিময়ে, তবে তা কোনোভাবেই টেকসই উন্নয়ন হতে পারে না। কাগুজে সনদের আড়ালে থাকা অনিয়ম বন্ধ করে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে প্রতিটি জাহাজের রাসায়নিক পরীক্ষা নিশ্চিত করা এবং নিয়মতান্ত্রিক তদারকি প্রতিষ্ঠা করাই এখন সময়ের একমাত্র দাবি।

জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, দায়িত্বশীলরা সরেজমিনে না গিয়ে অফিসে বসে সনদগুলো দিয়ে দেয়। যে কারণে একটি পুরোনো জাহাজ ঝুঁকিমুক্ত না হলেও ভাঙার অনুমোদন পেয়ে যাচ্ছে। আর অফিসে বসে সনদ কোন প্রক্রিয়ায় দেওয়া হয়, তা সহজেই অনুমেয়। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের একজন আছেন। তার অধীনে মনে হয় আরেকজন আছেন।

দুজনের পক্ষে পুরো চট্টগ্রামের দায়িত্ব পালন করা কঠিন। আবার যারা আছেন তারা জাহাজভাঙা শিল্পের জন্য দক্ষ কি না, সেই প্রশ্নও আছে। লোকবলও নেই। যারা আছেন তাদের সরেজমিনে গিয়ে দেখার ইচ্ছাও নেই। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হলো টাকা কামানো। এই দুর্ঘটনার পর বিস্ফোরক অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলদের প্রথমেই গ্রেপ্তার করা উচিত ছিল। কারণ তাদের সনদের ওপর নির্ভর করেই শ্রমিকরা জাহাজটি ভাঙতে নেমেছিলেন।

বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের প্রধান ও সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন জানান, তারা সাধারণত জাহাজের ইঞ্জিন গ্যাসমুক্ত করা হয়েছে কি না, তা সরেজমিনে গিয়ে দেখেন। বর্তমানে দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটির পানির ট্যাংকে বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পানির ট্যাংক তাদের পরিদর্শনের আওতায় পড়ে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর আসল তথ্য বেরিয়ে আসবে। অফিসে বসে সনদ দেওয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন। পাশাপাশি জনবলসংকটের বিষয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন বলেও জানান।