পুঁজিবাজারে রক্তক্ষরণে নিঃস্ব হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা, বীমা খাতের শেয়ার বিক্রির হিড়িক
শহীদুল ইসলাম, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজারে টালমাতাল আচরণে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে বিনিয়োগকারীদের। ফলে টানা দরপতনে চলছে বিনিয়োগকারীদের রক্তক্ষরণ। আর অস্থিরবাজারে প্রায় প্রতিদিনই কমছে মূল্যসূচক। এরচেয়েও বেশি কমছে শেয়ারের দাম। আতঙ্কিত বিনিয়োগকারীদের অনেকেই যে কোনো মূল্যে শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বের হয়ে যেতে মরিয়া হয়ে উঠছেন। তাতে বাজারে বিক্রির চাপ বেড়ে গেছে। ফলে দেখে মনে হচ্ছে পুঁজিবাজার যেন এক আতঙ্কের নাম। ফলে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় পতনে লেনদেন শেষ হয়েছে।
মুলত সূচকের বড় দরপতনের নেপথ্যে রয়েছে বীমা খাত। বীমা খাতের পাশাপাশি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ওষুধ, বস্ত্র, আইটি, মিউচুয়াল ফান্ডসহ সব খাতের বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। এদিন সূচকের সাথে কমেছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর। তবে টাকার পরিমাণে লেনদেন কিছুটা বেড়েছে। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
মুলত নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের অভাবে টেক্সটাইল, ডাইং, সিরামিক, স্টিলসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী তালিকাভুক্ত কোম্পানির উৎপাদন সক্ষমতা চরমভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারখানাগুলো পুরোদমে উৎপাদনে থাকতে না পারলে কোম্পানিগুলোর সামগ্রিক করপোরেট আয় বা মুনাফা তলানিতে ঠেকবে, আর তা শেষ পর্যন্ত দেশের প্রধান দুই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত—রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ধস নামাতে পারে। এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধস নেমেছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক পুঁজিবাজারে।
পাশাপাশি দেশের চলমান জাতীয় গ্যাস সংকট নিরসন না হওয়ায় কোম্পানিগুলোর করপোরেট আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, যা বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে গত সপ্তাহের শেষের দিকে বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও দেশীয় নানামুখী চ্যালেঞ্জ ও ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল ছিল, যার ফলে বাজারে বড় ধরণের ক্রয়গতি তৈরি হতে পারেনি।
বাজার সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে যে ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ন্ত্রণে বর্তমান কমিশন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। তাদের মতে, টানা পতনের পর গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে সূচকে নামমাত্র উত্থান দেখা গেলেও সেটি বাজারে আস্থা ফেরানোর মতো কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।
বাজার সংশ্লিষ্টরা আরও বলেন, সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে মনে হয়, যারা বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছেন তারা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। তা না হলে পুঁজিবাজারের এমন বেহাল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা নয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজারে যে স্থিতিশীলতার আভাস তৈরি হয়েছিল, বর্তমান কমিশনের সময়ে তা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। কোনোভাবেই ধারাবাহিক পতনের ধারা থেকে বাজার বের হতে পারছে না। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
তাদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে পুঁজিবাজারের অবস্থা আরও করুণ হতে পারে। তাই বাজারের স্থিতিশীলতা ফেরাতে কমিশনকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে তারা বলেছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে কমিশনের সদস্যদের সম্মানের সঙ্গে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো উচিত।
বাজার সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ আরও সতর্ক করে বলেন, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বর্তমান কমিশনের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হতে পারেন। তখন ব্যর্থতার দায় নিয়ে কমিশনকে অপমানজনক পরিস্থিতিতে পদত্যাগ করতে হতে পারে। তাই বিনিয়োগকারীদের দাবি, কমিশন হয় বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনুক, নতুবা সম্মানের সঙ্গে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াক।
অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, বর্তমান কমিশনকে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছে না। ধারাবাহিক উত্থানের সময় বাজারে যে পরিমাণ পুঁজি ফিরেছিল, পরবর্তী সময়ে টানা পতনের কারণে তা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন, পুঁজিবাজার সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কেন নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্বে রয়েছেন। তাদের মতে, পুৃঁজিবাজার সম্পর্কে অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিদেরই কমিশনের দায়িত্বে থাকা উচিত।
তাদের অভিযোগ, নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। এর ফলে পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। বাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখে অনেকে নতুন করে বিনিয়োগ করেছিলেন এবং আরও অনেকে বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে বাজারের এমন পরিস্থিতিতে তারা নতুন করে বিনিয়োগ করতে আস্থা পাচ্ছেন না। তাই কমিশনের উচিত দ্রুত বাজারকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
জানা গেছে, দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ৬৩ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৭২২ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১৫ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ১৪০ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ১৭ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ২ হাজার ১৪৫ পয়েন্টে।
দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৮৬ কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ৩২ টির, দর কমেছে ৩২৪ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৩০ টির। ডিএসইতে ৭১১ কোটি ১৪ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ৩৯ কোটি ১৬ লাখ টাকা বেশি। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৬৭১ কোটি ৯৮ লাখ টাকার ।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৬১ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৪২৯ পয়েন্টে। সিএসইতে ২১৮ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ৪৮ টির দর বেড়েছে, কমেছে ১৪৯ টির এবং ২১ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।



