শহীদুল ইসলাম, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: নির্বাচনের পর নতুন সরকার ও নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। এর ওপর ভর করে কিছুটা গতি ফিরেছিল দেশের পুঁজিবাজারে। তবে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন বাস্তবে না ঘটায় এখন পুঁজিবাজারে দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র। টানা দরপতনে গত দুই মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রধান সূচক ৫১৭ পয়েন্ট কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও আস্থার সংকট তীব্র হচ্ছে। আবারও পুঁজি হারানোর আতঙ্ক পেয়ে বসেছে বিনিয়োগকারীদের।

তবে গত জুন মাসে পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নতুন চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পেয়েছেন মাসুদ খান। মুলত দায়িত্ব পাওয়ার ৫ মাস পেরিয়ে গেলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে কতটুকু সফল হয়েছেন এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বিনিয়োগকারীসহ বাজার সংশ্লিষ্টদের মাঝে। বরং বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা আবারও ভারী হচ্ছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আবারও বিনিয়োগ করা পুঁজি হারানোর শঙ্কা পেয়ে বসার পাশাপাশি আস্থার সংকটও তৈরি হচ্ছে। ফলে ক্রমান্বয়ে ডুবতে বসেছে পুঁজিবাজার।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুঁজিবাজারে বর্তমান দুর্বলতার পেছনে একাধিক মৌলিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমত ডিএসই অযোচিত হস্তক্ষেপ, বিশেষ করে ডিএসইর তদন্ত-চিঠি-ফোন ইস্যুতে পুঁজিবাজারে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। মুলত পুঁজিবাজারে শেয়ার কেনাবেচা ও অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্তকরণ এবং বাজার তদারকির নামে অতিরিক্ত নজরদারির ভয়ে বড় বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

শেয়ারদর বাড়লেই তদন্ত কমিটি গঠন ও লেনদেনের ব্যাখ্যা চেয়ে প্রতিবেদন পাঠানো এবং জরিমানার নোটিশ দেওয়ার মতো পদক্ষেপে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। একাধিক বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে লেনদেনের পেছনের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান না করেই সন্দেহের ভিত্তিতে প্রতিবেদন পাঠানো হচ্ছে। এতে বাজারে সক্রিয়ভাবে বিনিয়োগের পরিবর্তে সতর্ক ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন বড় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ।

এছাড়া ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নজরদারি ও তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যার ঘাটতি রয়েছে। শেয়ারদর বাড়লে কারসাজির সন্দেহে তদন্ত ও কমিটি গঠনের তৎপরতা দেখা গেলেও দরপতনের ক্ষেত্রে একই ধরনের সক্রিয়তা সব সময় চোখে পড়ে না।

ফলে পুঁজিবাজারে দরপতন যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে পুঁজিবাজারে চলছে ডিভিডেন্ড ঘোষণার মৌসুম। এরই ধারাবাহিকতায় বেশ কয়েকটি কোম্পানি ভালো লভ্যাংশ ঘোষণা করলেও এর প্রভাব নেই পুঁজিবাজারে। এর মধ্যে চারটি কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর সর্বোচ্চ পরিমাণ লভ্যাংশ ঘোষণা করছে। তবে এমন ইতিবাচক ঘোষণার পরও সংশ্লিষ্ট শেয়ারগুলোর দামে উল্লেখযোগ্য প্রভাব দেখা যায়নি। বিষয়টিকে হতাশাজনক বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, সাধারণত ভালো কোনো কোম্পানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লভ্যাংশ ঘোষণা করলে সেই কোম্পানির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ে। তারা মনে করছেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দক্ষতা ও ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। বাজারের এমন অবস্থায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে দৃশ্যমান তৎপরতা কিংবা জোরালো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। তাদের কার্যক্রম দেখে বাজার স্থিতিশীল করার বিষয়ে যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে কি না, সে প্রশ্নও উঠছে। দীর্ঘদিনের দরপতন থেকে উত্তরণে কমিশনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান না হওয়ায় হতাশা বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।

অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী কাজী হোসাইন আলী বলেন, পুঁজিবাজার স্থিতিশীল করতে হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, বড় বিনিয়োগকারীদের অহেতুক হয়রানি না করা, ভালো কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আনা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং শিল্প খাতের জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদে অর্থায়নের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় কেবল আশাবাদী বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে বাজারে টেকসই উত্থান ও স্থিতিশীল করা সম্ভব নয়।

জানা গেছে, সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের পতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। এদিন সূচকের সাথে কমেছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর ও টাকার পরিমাণে লেনদেন। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ১২ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৩৮৬ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৬ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ৪৬ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ২ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ২ হাজার ৮৭ পয়েন্টে।

দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৮৭ কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১০৮ টির, দর কমেছে ২২৬ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৫৩ টির। ডিএসইতে ৪০৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ৭ কোটি ৭ লাখ টাকা কম। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৪১০ কোটি ৫৭ লাখ টাকার।

অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৬৯ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৪৮৯ পয়েন্টে। সিএসইতে ১৬৮ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ৫২ টির দর বেড়েছে, কমেছে ৯২ টির এবং ২৪ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ১৪ কোটি ৭২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।