ডিএসইর ‘সর্ষের মধ্যে ভূত’ খুঁজতে নেমেছে বিএসইসি
বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজারে কারসাজি এবং বিনিয়োগকারীদের সর্বস্বান্ত হওয়ার পেছনে বাজার পরিচালনকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) শীর্ষ কর্মকর্তাদের দায় নিয়ে নানা অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ যেন ‘সর্ষের মধ্যে ভূত’। এবার সেই ‘ভূত’ খুঁজতে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এবার খোদ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) চাকরিবিধিতে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের নির্ধারিত নিকটাত্মীয়দের শেয়ার ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে ডিএসইর বর্তমান প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা (সিআরও) মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার স্ত্রীর নামে ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত একটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানে বিও হিসাব চালু রেখে শেয়ার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) থেকে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, শফিকুল ইসলামের স্ত্রী মাহবুবা চৌধুরীর নামে সালতা ক্যাপিটালে একটি বিও হিসাব ছিল। হিসাব নম্বর ১২০৩৬১০০৪০১৪৯৫৪৬। ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত হিসাবটি চালু ছিল। পরে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই সময়ে শফিকুল ইসলাম ডিএসইর লিস্টিং বিভাগে ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি ডিএসইতে যোগদান করেন।
ডিএসইর চাকরিবিধি অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা তাদের ওপর নির্ভরশীল আট ধরনের নিকটাত্মীয় শেয়ার বা সিকিউরিটিজ ব্যবসায় যুক্ত হতে পারেন না। এ তালিকায় রয়েছেন বাবা-মা, স্বামী বা স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন, শ্বশুর-শাশুড়ি এবং শ্যালক-শ্যালিকা। চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে শেয়ার ব্যবসা বা বিও হিসাব থাকলে তা বন্ধ করারও বিধান রয়েছে।
সিডিবিএলের তথ্য অনুযায়ী, ওই বিও হিসাব থেকে ফু-ওয়াং ফুড, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, নাভানা সিএনজি, প্রিমিয়ার লিজিং, মালেক স্পিনিং ও বিডি ওয়েল্ডিংসহ একাধিক কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে। এসব কোম্পানির কয়েকটি শেয়ার নিয়ে অতীতে কারসাজির অভিযোগ ছিল। তবে সংশ্লিষ্ট বিও হিসাবের লেনদেনের সঙ্গে কারসাজির কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, তা পৃথকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্ত্রীর নামে শেয়ার লেনদেনের বিষয়ে জানতে চাইলে শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া লেনদেনের কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, যখন ওই বিও থেকে ট্রেড হয়েছে, তখন শেয়ার কর্মকর্তা বা নিকটাত্মীয়দের লেনদেন নিয়ে ডিএসইর কোনো সার্কুলার ছিল না। এ-সংক্রান্ত সার্কুলার আসার পর বিও হিসাবটি বন্ধ করা হয়। তা ছাড়া মাহবুবা চৌধুরী বর্তমানে আমার স্ত্রী নন। তবে তার নিয়োগপত্রে দেওয়া শর্ত অনুযায়ী, চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তিনি বা তার নিকটাত্মীয় শেয়ার বা সিকিউরিটিজ ব্যবসায় যুক্ত হতে পারবেন না।
এর আগে ২০১৬ সালে রহিমা ফুডের মূল্য সংবেদনশীল তথ্য আটকে রাখার অভিযোগও উঠেছিল শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনার পর তাকে ডিএসইর লিস্টিং বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তাকে আর ওই বিভাগে পদায়ন করা হয়নি।
ডিএসইর এক কর্মকর্তা বলেন, সিআরও শফিকুল ইসলামের প্রতি ডিএসইর দুজন পরিচালকের ‘আশীর্বাদের হাত’ রয়েছে। এ কারণে এত বছরেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন ওই কর্মকর্তা। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আল-আমিন বলেন, বিষয়টি ডিএসইর খতিয়ে দেখা উচিত। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইনে কী ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে পারে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থাও এ বিষয়ে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নিতে পারে। এছাড়া স্বার্থের সংঘাত এড়াতেই এ ধরনের কর্মকাণ্ড আইনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যদি পদ বা দায়িত্বের কারণে অভ্যন্তরীণ তথ্য জানার সুযোগ পান এবং সেই তথ্য কাজে লাগিয়ে লেনদেন করেন, তাহলে বাজারে প্রভাব বিস্তার বা কারসাজির সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়। তাই আইনে নিষিদ্ধ কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার সুযোগ নেই।
ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নুজহাত আনোয়ার বলেন, কর্মীদের কাছ থেকে আমরা এখন কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট-সংক্রান্ত ঘোষণা নেওয়া শুরু করেছি। এ ঘোষণায় কর্মীর স্বামী বা স্ত্রী (স্পাউস) এবং নির্ভরশীল ব্যক্তিদের কোথাও কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা বা অ্যাকাউন্ট আছে কি না, তা পূর্ণাঙ্গভাবে উল্লেখ করতে হয়। আমাদের সার্ভিস রুলেও এ বিষয়ে স্পষ্ট বিধান রয়েছে। কর্মীর কোনো নির্ভরশীল ব্যক্তি ডিএসইতে অ্যাকাউন্ট খুলতে বা লেনদেন করতে পারবেন না। এরপরও কারও ক্ষেত্রে এ ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প থাকবে না।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, আইন অনুযায়ী ডিএসইর কোনো কর্মকর্তা বা তার নিকটাত্মীয় শেয়ার বা সিকিউরিটিজ ব্যবসা করতে পারেন না। কেউ এমনটি করলে তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



