তৌফিক ইসলাম, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: চার মাসের দীর্ঘ চিকিৎসা-যাত্রা শেষে গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১টা ২৫ মিনিটে গুলশানের ফিরোজা ভবনে পা রাখলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে অনেকদিন ধরেই গুঞ্জন, তিনি আর ফিরবেন না, হয়তো দেশের মাটিতে আর রাজনীতি করবেন না। সেই সব গুজব, সন্দেহ আর অপেক্ষার অবসান হলো।

ফলে রাজকীয় মর্যাদায় চিকিৎসা শেষে তিনি দেশে ফেরেন কাতারের আমিরের দেওয়া একটি বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে। ফলে বিমানবন্দর থেকে গুলশান পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে হাজার হাজার নেতাকর্মী জড়ো হন তাকে শুভেচ্ছা জানাতে। বহু মানুষ সকালে রওয়ানা দিয়ে দুপুরে এসে দাঁড়ান ফিরোজার সামনের রাস্তায়। কারো হাতে ছিল ফুল, কেউ আবার এনেছিলেন নেত্রীর ছবি। কান্নাভেজা চোখে অনেককেই বলতে শোনা গেছে, ‘আমাদের মা ফিরে এসেছেন’, ‘খালেদা জিয়া মানেই বাংলাদেশ’।

ফিরোজার সামনের রাস্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনী ছিল। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাবের সদস্যরা তৎপর থাকলেও নেতাকর্মীদের আবেগ থামানো যায়নি। হেঁটে হেঁটে কেউ এসেছেন টঙ্গী থেকে, কেউ বা নারায়ণগঞ্জ থেকে। ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড থেকে হাজারো মানুষ এসে দাঁড়িয়েছিলেন রাস্তার মোড়ে মোড়ে। বিএনপি চেয়ারপারসনের বিদেশ যাত্রার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে গুজন ছিল, এটাই তার শেষ বিদায়। অনেকে বলেছিলেন, খালেদা জিয়া ‘মাইনাস টু’র শিকার হয়েছেন, আর ফিরবেন না। কিন্তু এই প্রত্যাবর্তনে গুজবের অবসান হলো। নেতাকর্মীরা বলছেন, গণতন্ত্র আবার আশার আলো দেখছে।

বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়া ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধের প্রতীক। তিনি ফিরে আসায় গণতন্ত্রের উত্তরণ সহজ হবে। এই জাতির জন্য এটি একটি নতুন প্রত্যাশার দিন। খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার দুই পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান ও সৈয়দা শামিলা রহমানও দেশে এসেছেন। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর দেশত্যাগের পর এবারই প্রথম দেশে ফিরলেন তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান। এ দিনটি তাই আরও স্মরণীয় হয়ে উঠেছে বিএনপি সমর্থকদের কাছে।

এদিকে লন্ডনে চিকিৎসা শেষে দীর্ঘ চার মাস পর গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় প্রবেশ করেন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তবে হুইল চেয়ার নিয়ে চলাচল করা বিএনপি চেয়ারপারসন সবাইকে অনেকটা বিস্মিত করে দিয়ে বাসায় প্রবেশ করেন পায়ে হেঁটে । এ সময় দুই পুত্রবধূকে তাকে ধরে রাখতে দেখা যায়। খালেদা জিয়ার এই সুস্থতা থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা বেশ উচ্ছ্বসিত হন। এর  মাধ্যমে বিএনপির চেয়ারপারসন যে এখন অনেকটাই সুস্থ সেই বার্তাই পেলেন নেতাকর্মীরা।সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়ে কারাগারে যাওয়ার দিন খালেদা জিয়া পায়ে হেঁটেই গিয়েছিলেন।

তবে ২০২০ সালের মার্চে যখন বের হন তখন হুইল চেয়ারে বের হয়েছিলেন। এরপর থেকে তার অবস্থার শুধু অবনতিই হয়েছে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার রোষানলে পড়ে কারাগারে থাকা অবস্থায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। বেশ কয়েক বার জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চলে গিয়েছিলেন তিনি।

এমনকি কয়েক বার ‍মৃত্যুর গুজবও ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। দেশে করোনা ভাইরাসে শুরুর প্রাক্কালে নির্বাহী আদেশে মুক্তি মিললেও ছিলেন নানা বিধি-নিষেধের মধ্যে বন্দি ছিলেন বাসার চার দেয়ালে। তবে গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন ঘটলে মুক্তি মেলে খালেদা জিয়ার। মামলা থেকে খালাস পাওয়ায় পথ খুলে বিদেশে যাওয়ার। নানা জল্পনা-কল্পনার পর গত জানুয়ারির শুরুর দিকে তিনি লন্ডনে যান উন্নত চিকিৎসার জন্য।