আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের রেকর্ড পরিমান দরপতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। ফলে এদিন অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের ক্রয় সংকট দেখা দিয়েছে। মুলত বড় দরপতনে একদিনেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) বাজার মূলধন কমেছে ৭ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকার বেশি। যার ফলে টানা দরপতনের বৃত্তে আটকে গেছে দেশের পুঁজিবাজার। এছাড়া অব্যাহত পতনের মধ্যে পড়ে সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর ১২২ পয়েন্ট সূচক উধাও। তবে বড় পতনেও লেনদেন কিছুটা বেড়েছে।

মুলত পুঁজিবাজার ইস্যুতে বিএসইসি চেয়ারম্যানের হুটহাট সিদ্ধান্ত ও মার্জিন ইস্যুতে হঠকারী সিদ্ধান্ত ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনরের পুঁজিবাজার তালিকাভুক্ত পাঁচ ব্যাংক ইস্যুতে বির্তকিত সিদ্ধান্তের ফলে আস্থা সংকট বিনিয়োগকারীরা বাজারমুখী হয়ে পড়ছেন। এছাড়া বিনিয়োগকারীরা লোকসানে শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন।

মুলত ছাত্র-জনতার বিপ্লবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের অর্থনীতির অন্যান্য খাতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও ব্যতিক্রম শুধু পুঁজিবাজার। গত ১৪ মাসে পুঁজিবাজারের বৃদ্ধি তো দূরের কথা, উল্টো প্রতিদিনই কমছে মূল্যসূচক ও বাজার মূলধন। ফলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার ইঙ্গিত মিললেও পুঁজিবাজার চলছে সেই পুরানো উল্টো পথে।

ফলে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৪ মাস পুঁজিবাজারের কোন উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বারবার আস্থার সংকট, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া দেশের অর্থনীতিতে তেমন কোন অবদান রাখতে পারছে না পুঁজিবাজার। বিনিয়োগকারীরা মনে করে বিএসইসির অদক্ষ্য ও অযোগ্য কমিশনের কারণে বেহাল দশা দেশের পুঁজিবাজারের।

এদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল না করে সংস্কারের নামে একের এক এক কির্তকিত সিদ্ধান্তে বাজারকে অস্থিতিশীল করছেন। ফলে ক্রমান্বয়ে পুঁজিবাজার ডুবতে বসেছে। স্পর্শকাতর এই খাতটির সঙ্গে লাখ লাখ বিনিয়োগকারীদের সরাসরি বিনিয়োগ জড়িত, প্রতিদিনের লেনেদেনের প্রতিফলন ঘটে সূচক উঠা-নামার মাধ্যমে, ফলে বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়াটিও সূচকের সমান্তরাল রেখায় প্রতিফলিত হয়। সূচক ও লেনদেন তলানিতে নামছে, যেন দেখার কেউ নেই।

ফলে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ কমিশনের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। গত বছরের ১৮ আগস্ট চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচক কমেছে ১০৭৬ পয়েন্ট। মুলত রাশেদ মাকসুদ কমিশন যখন দায়িত্ব নেয় তখন ডিএসই সূচক ছিলো ৫৭৭৮.৬৩ পয়েন্ট। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর সূচক এসে দাঁড়িয়েছে ৪৭০২.৬৮ পয়েন্ট। আর দৈনিক লেনদেনের ধীর গতিতে সন্তুষ্ট হতে পারছে না বিনিয়োগকারীরা। এছাড়া কমিশন সংক্রান্ত বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে বিনিয়োগকারীদের মনে তৈরি করেছে বড় আস্থার সংকট।

মুলত নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) মার্জিন ঋণ বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। এ নতুন বিধিমালা নিয়ে মতপার্থক্য থাকায় হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন বিনিয়োগকারীরা। এ কারণে পুঁজিবাজারে বড় পতন ঘটেছে। এতে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক দিন ধরে পুঁজিবাজারে লেনদেনের শুরুতে সূচকের উত্থান দেখা গেলেও লেনদেন শেষে তা পতনে রূপ নেয়। বৃহস্পতিবার সকালে ডিএসইএক্স সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় লেনদেন শুরু হয়। তবে, লেনদেন শুরুর ৮ মিনিট পর থেকে সূচকের পতন দেখা যায়। লেনদেনের শেষ পর্যন্ত সূচকের পতন অব্যাহত ছিল। কয়েক মাসের ব্যবধানে পুঁজিবাজারে লেনদেন অনেক কমেছে।

ডিএসই ও সিএসই সূত্রে জানা গেছে, দিনশেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ১২২.৬৪ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৪ হাজার ৭০২ পয়েন্টে। এর আগে চলতি বছরের গত ২৩ জুন সূচকটি ছিল ৪ হাজার ৬৯৫ পয়েন্টে। বৃহস্পতিবার সূচকটি সাড়ে ৪ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে। এদিন ডিএসই শরিয়াহ সূচক ২৮.৯৮ পয়েন্ট কমে ৯৭৬ পয়েন্টে এবং ডিএসই৩০ সূচক ৪৭.৭১ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৮৫১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।

ডিএসইতে মোট ৩৮৪টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে ১৫টি কোম্পানির, কমেছে ৩৫২টির এবং অপরিবর্তিত আছে ১৭টির। এদিন ডিএসইতে মোট ৩৮৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ২৯০ কোটি ১৩ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট।

অন্যদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সিএসসিএক্স সূচক আগের দিনের চেয়ে ১৩৩.১৯ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৮ হাজার ৩১৩ পয়েন্টে। সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ২১৮.৯৫ পয়েন্ট কমে ১৩ হাজার ৩৯৯ পয়েন্টে, শরিয়াহ সূচক ১৬.৮৩ পয়েন্ট কমে ৮৪৩ পয়েন্টে এবং সিএসই ৩০ সূচক ১৫৯.৪৪ পয়েন্ট কমে ১২ হাজার ১৭০ পয়েন্টে অবস্থান করছে।

সিএসইতে মোট ১৬০টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে ১৮টি কোম্পানির, কমেছে ১৩৮টির এবং অপরিবর্তিত আছে ৪টির। সিএসইতে ৭ কোটি ২২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৯ কোটি ৮০ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট।