পুঁজিবাজার ছাড়ছেন বিনিয়োগকারীর সঙ্গে ট্রেক হোল্ডাররাও
দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘ সময় ধরে ক্রান্তিকাল বিরাজ করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিলেও, সেই স্বপ্নে ফাটল ধরতে বেশি সময় লাগেনি। দুর্বল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্লিষ্টদের তদারকির ঘাটতির কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চরম ভাটা পড়ে।
এতে বাজারে অস্থিরতা লেগেই থাকে। এই অস্থিরতা ও অনাস্থার কারণে বিনিয়োগকারীদের বড়ো একটি অংশ বাজারে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। শুধু বিনিয়োগকারীই নয়, বাজার অংশীজনরাও (ট্রেক হোল্ডার) নিজেদের ব্যবসা ছোট করে নিচ্ছেন। ব্রোকারেজ হাউজগুলোর শাখা অফিসের পাশাপাশি কেউ কেউ মূল অফিসের কার্যক্রম বন্ধ রাখায় লেনদেন তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছে। হতাশ হয়ে বাজার ছাড়ছেন বিনিয়োগকারীরা।
বাজার চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের শুরু থেকে গত ২০ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসইএক্স) সূচক কমেছে ৩৫০ পয়েন্ট। বাজারে গড় লেনদেনও আগের বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। এই সময়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিষ্ক্রিয় হয়েছেন প্রায় ৬৭ হাজার বিনিয়োগকারী।
দৈনিক লেনদেনের চাপ কমায় ট্রেক হোল্ডাররাও তাদের ব্যাবসায়িক গণ্ডি ছোট করে নিয়েছেন। কেউ কেউ ব্রোকারেজ হাউজের লেনদেন ব্যবস্থা সংস্কার কাজের কথা জানিয়ে কৌশলে লোকসান এড়াতে বন্ধ রাখছেন শেয়ার কেনা-বেচার কার্যক্রম।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারের এই দুরবস্থা একদিনে তৈরি হয়নি। ২০১০ সালের মহাধসের পর মার্জিন ঋণ সমন্বয় না করে ঝুলিয়ে রাখা এর অন্যতম কারণ। ওই সময় যদি মার্জিন ঋণ সমন্বয় করা হতো, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এই বিষয়টি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারতো না।
তাছাড়া, গত ১৫ বছরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে যেসব শেয়ার পুঁজিবাজারে এসেছে, তার মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি ভালো ছিল। বছরের পর বছর ধরে বাজার যে খারাপ আচরণ করছে, এটি আগের ভুল সিদ্ধান্তেরই ফল।
দীর্ঘ বছরের খারাপ সিদ্ধান্তের কারণেই ২০১০ সালের ৩৬ লাখ বেনিফিশারি ওনার্স বা বিও হিসাবধারীর সংখ্যা এখন ১৬ লাখে নেমেছে। আর বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমায় বাজারে লেনদেনও কমেছে। এতে লেনদেন থেকে ব্রোকারেজ হাউজগুলো যে কমিশন পাচ্ছে, তা নিয়ে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।
লেনদেন কমায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিএসইর পরিচালন লোকসান হয়েছে ৪৯ কোটি টাকা এবং সিএসইতে যা প্রায় ১৫ কোটি টাকা। শুধু এই অর্থবছরেই নয়, আগের অর্থবছরেও লেনদেন খরায় স্টক এক্সচেঞ্জ দুটির বড়ো অঙ্কের পরিচালন লোকসান হয়েছিল।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেট (বিআইসিএম) এর নির্বাহী প্রেসিডেন্ট ওয়াজিদ হাসান শাহ বলেন, বাজারে ভালো শেয়ার থাকলে বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। তখন আর বাজারে লেনদেন স্বল্পতার ঝামেলায় পড়তে হয় না। আমাদের বাজারে হাজার কোটি টাকার নিচে লেনদেন হলেই স্টক এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ হাউজগুলোর টিকে থাকার সক্ষমতা ঝুঁকিতে পড়ে যায়। কেননা, স্টক এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ হাউজের প্রধান আয়ের উৎস লেনদেন থেকে প্রাপ্ত কমিশন।
তাই, এই স্টক এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে টিকিয়ে রাখতে ভালো শেয়ার নিয়ে আসা এবং লেনদেন বাড়ানোর বিকল্প নেই। তবে আগামী জাতীয় নির্বাচনের পর একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে দেশের পুঁজিবাজারে অনেকগুলো ভালো কোম্পানি আসবে এবং বিনিয়োগকারীও বাজারমুখী হবেন। তখন বাজারে বিনিয়োগের আইটেম ও লেনদেনের স্বল্পতা থাকবে না। বন্ধ হওয়া ব্রোকারেজ হাউজগুলোও তাদের শাখা পুনরায় চালু করবে।
বিও হিসাবধারীদের লেনদেন সুবিধা দিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে নিবন্ধিত ট্রেক সনদ নিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্যভুক্ত হয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে ব্রোকারেজ হাউজগুলো। এখন পর্যন্ত স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেক হোল্ডার হিসেবে ব্যবসা শুরু করেছে ৩০৭টি ব্রোকারেজ হাউজ।
এর মধ্যে গ্রাহক হিসাবে ঘাটতি থাকাসহ বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ৫টি ব্রোকারেজ হাউজের কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। সচল থাকা বাকি ৩০২টি ব্রোকারেজ হাউজের মূল অফিস ও শাখা অফিসের সংখ্যা প্রায় ১৫০০টি। এর মধ্যে অনেকেই বাজারে লেনদেন কম থাকায় লোকসান এড়াতে শাখা অফিস বন্ধ রাখার পাশাপাশি মূল অফিসের কার্যক্রমও কৌশলে বন্ধ রাখছে।
ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, ব্রোকারেজ হাউজগুলোর মূল অফিস ও শাখা অফিসের অধিকাংশই রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রাম অঞ্চলে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত ২০ নভেম্বর পর্যন্ত সচল থাকা ব্রোকারেজ হাউজগুলোর মূল অফিস ও শাখা অফিস বন্ধ হয়েছে ১১৭টি। বাজারে লেনদেন কম হওয়া, সনদ নবায়ন না হওয়া এবং অফিস সংস্কারের কথা জানিয়ে বন্ধ রাখা হচ্ছে এসব হাউজ। এর মধ্যে বিকল্প লেনদেন অফিস না থাকায় কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউজের হিসাবধারী এখন শেয়ার লেনদেনও করতে পারছে না।
চলতি বছর সাদ সিকিউরিটিজের দুটি শাখা অফিস বন্ধ হয়েছে। তাদের মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জের অফিস দুটি বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিকিউরিটিজ হাউজটির চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসাইন বলেন, বাজার এখন যে গতিতে চলছে, তাতে শুধু শাখা অফিস নয়, সব অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া উচিত।
শাখা অফিস রেখে খরচ বাড়ানো ছাড়া, কিছুই হচ্ছে না। যে বাজারে গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে একটি টাকাও বাড়েনি (আইপিও আসেনি), সেই বাজারে বিনিয়োগকারীই বা কেন থাকবে? আর বিনিয়োগকারী নেই বলেই তো আমরা ব্যবসা চালিয়ে নিতে না পেরে শাখা অফিস বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছি।
ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, সাময়িক বন্ধ রয়েছে ইউনাইটেড সিকিউরিটিজের প্রধান কার্যালয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি এটিকে বন্ধ না বলে বলছে প্রধান কার্যালয়ে সংস্কার কাজ চলছে। সাধারণত, প্রতি ১০০ টাকার শেয়ার লেনদেনের উপর সর্বনিম্ন ৩৫ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ৫০ পয়সা পর্যন্ত লেনদেন কমিশন নিতে পারে ব্রোকারেজ হাউজ। অর্থাৎ, কোনো বিনিয়োগকারী ১০০ টাকার শেয়ার কিনলে বা বিক্রি করলে তা থেকে সর্বনিম্ন ৩৫ পয়সা ও সর্বোচ্চ ৫০ পয়সা পর্যন্ত কমিশন কেটে নিতে পারে ব্রোকারেজ হাউজ। ব্রোকারেজ হাউজগুলোর এই আয় থেকে শতকরা সর্বনিম্ন ১০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ২০ পয়সা পর্যন্ত কমিশন নেয় স্টক এক্সচেঞ্জ।
অর্থাৎ, এক লাখ টাকা লেনদেন হলে ব্রোকারেজ হাউজ পায় ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা এবং স্টক এক্সচেঞ্জ পায় ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। এর বাইরে, প্রতিটি বিও হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ ফি বা মাশুল হিসেবে বছরে ৫০ টাকা হারে চার্জ নেয় ব্রোকারেজ হাউজ। এতদিন ১৫০ টাকা হারে এই চার্জ পেত, যা সম্প্রতি কমিয়ে ৫০ টাকা করা হয়েছে।
এই চার্জের ভাগ অবশ্য স্টক এক্সচেঞ্জ পায় না। তবে স্টক এক্সচেঞ্জ তালিকাভুক্ত কোম্পানি থেকে চার্জ, ডেটা বিক্রয়, লাইসেন্সিং ফি এবং প্রশিক্ষণ একাডেমির কার্যক্রম থেকেও রাজস্ব আয় করে থাকে। এতসব আয়ের মাধ্যম থাকলেও লেনদেন থেকে প্রাপ্ত কমিশন আয়ই স্টক এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ হাউজের প্রধান উৎস।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে গত ২০ নভেম্বর পর্যন্ত পুঁজিবাজারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৬৬ হাজার ৭৭৭টি বিও হিসাবধারী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে সরাসরি বিও হিসাব বন্ধ হওয়ায় বাজার ছেড়েছেন ৪৭ হাজার ৩১৭ জন বিনিয়োগকারী। এছাড়া ১৯ হাজার ৪৬০ জন বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব শেয়ার শূন্য হয়েছে আলোচিত সময়ে।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ নভেম্বর শেষে পুঁজিবাজারে মোট বিও হিসাবের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৩৫ হাজার ৩৭২টি।
গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর যা ছিল ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৪৫২টি। আর গত ২০ নভেম্বর শেষে শেয়ারশূন্য বিও হিসাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৪৯৮টি। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে যা ছিল ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৯৭৪টি। বিনিয়োগকারীর পুঁজিবাজার ছেড়ে দেওয়া এবং বাজারে লেনদেন উল্লেখযোগ্যহারে কমে যাওয়ায় ব্রোকারেজ হাউজগুলোর পাশাপাশি স্টক এক্সচেঞ্জও ভালো ব্যবসা করতে পারছে না। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বড়ো অঙ্কের পরিচালন লোকসান হয়েছে। স্টক এক্সচেঞ্জ দুটির ব্রোকারেজ হাউজ থেকে প্রাপ্ত লেনদেন কমিশনে ভাটা পড়ায় এই লোকসান গুনতে হয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে দেড় লাখ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল। সেই হিসাবে বছরের ব্যবধানে ডিএসইর লেনদেন কমেছে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা বা ২৬ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ৬ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে যা হয়েছিল ৭ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে সিএসইর লেনদেন কমেছে ৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা বা ৪৬ শতাংশ।
লেনদেন কমায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিএসইর পরিচালন লোকসান হয়েছে ৪৯ কোটি টাকা এবং সিএসইতে যা প্রায় ১৫ কোটি টাকা। শুধু এই অর্থবছরেই নয়, আগের অর্থবছরেও লেনদেন খরায় স্টক এক্সচেঞ্জ দুটির বড়ো অঙ্কের পরিচালন লোকসান হয়েছিল। ওই বছর ডিএসইতে ২১ কোটি টাকা এবং সিএসইতে ১১ কোটি টাকা পরিচালন লোকসান হয়েছিল।
ডিএসইর শেয়ারহোল্ডার পরিচালক রিচার্ড ডি রোজারিও বলেন, আমাদের দেশের পুঁজিবাজারের আকার অনুযায়ী ৯০০ থেকে এক হাজার কোটি টাকা লেনদেন না হলে ব্রোকারেজ হাউজগুলোর টিকে থাকার সক্ষমতা থাকে না। শুধু ব্রোকারেজ হাউজই নয়, স্টক এক্সচেঞ্জেরও টিকে থাকার সক্ষমতা থাকে না।
স্টক এক্সচেঞ্জের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা থাকলেও অধিকাংশ ব্রোকারেজ হাউজেরই সেটি নেই। ফলে লোকসান করে চলতে হচ্ছে অনেক হাউজকেই। এমন পরিস্থিতিতে ব্রোকারেজ হাউজগুলোর মূল অফিস কিংবা শাখা অফিস বন্ধ হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।



