আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বছরের পর বছর চরম অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার শিকার দেশের পুঁজিবাজারে হঠাৎ আস্থা ও প্রত্যাশার ঝলকানি দিয়ে আবার যেন তা হাওয়ায়ই মিলে গেল। দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত পুঁজিবাজার নানামুখী বিতর্কের কারণে দীর্ঘ মন্দার মধ্য দিয়ে পার করে এলেও নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম কার্যদিবসে তার জানানও দিয়েছিলেন বিনিয়োগকারীরা।

কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এখনো পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এতে নতুন করে আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। কারণ সাধারণত সারা বিশ্বে কোনো নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির প্রথম আভাসটি আসে পুঁজিবাজার থেকে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম কার্যদিবসেও তেমনই ইঙ্গিত ছিল দেশের পুঁজিবাজারের আগামী দিনের পথ চলার। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার সাথে বাজারের বাস্তবতা ভিন্ন আচরণ করছে।

মুলত আবারও আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নেতৃত্বের ওপর। গত আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ওলটপালট হয়ে যাওয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পুনর্গঠিত কমিশনের ওপর আস্থার ঘাটতি নয়া এক সংকটেরই বার্তা দেয় পুঁজিবাজারে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর আস্থার সংকট মানে বিনিয়োগে স্থবিরতা। যার কারণে নির্বাচন-পরবর্তী পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না।

এছাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গত দেড় বছর ছিল এক চরম পরিবর্তনের সময়। ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে বড় ধরণের সংস্কারের আশা করেছিলেন। কিন্তু সূচক ও লেনদেনের গতিপ্রকৃতি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ফলে বর্তমান বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নেতৃত্ব নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে,

তেমনি নতুন নেতৃত্বের গুঞ্জনও ডালপালা মেলেছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), সোনালী ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পদ ছাড়তে হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ইতোমধ্যে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিএসইসির নেতৃত্ব পরিবর্তনেরও পদধ্বনি পাওয়া যাচ্ছে।

কারণ ১৮ মাসে রাশেদ মাকসুদ কমিশন পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতা ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার পেছনে বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদী ও তাৎক্ষণিক কারণ কাজ করছে। বিগত ১৫ বছরে সুশাসনের অভাব, দুর্বল কোম্পানির আইপিও অনুমোদন এবং কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পুঁজি হারিয়েছেন।

একই সঙ্গে বাজারে সুশাসনের চরম ঘাটিতিও ছিল। এছাড়া বাজারে ফ্লোর প্রাইস আরোপের মতো কৃত্রিম ব্যবস্থার ফলে বাজারের স্বাভাবিক লেনদেন ব্যাহত হয়। সম্প্রতি অর্থনীতি নিয়ে গঠিত শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে বিএসইসির নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে আসে।

এছাড়া খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন ১৮ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর কারসাজি রোধে তৎপর হলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর নানা অনিয়মে হাজার কোটি টাকা জরিমানা করলেও বাজারে বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। প্রতিদিনই লেনদেন তলানিতে যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে একটু সূচকের উকি মারলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না পুঁজিবাজার।

এছাড়া যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও সাবেক অর্থ উপদেষ্টার পরিচিত হওয়ার সুবাদে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের পদ বাগিয়ে নেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। যে কারনে প্রত্যাশিতভাবেই পুঁজিবাজার হারিয়েছে গতিপথ এবং তার হাত ধরে কবরস্থানের দিকে ধাবিত রয়েছে। তবে সেই সময় ফুরিয়ে এসেছে।

তেমনি বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে কমিশন নতুন বিধিমালা প্রণয়ন, সংস্কার টাস্কফোর্স ও তদন্ত কমিটি গঠনসহ পুঁজিবাজার সংস্কারে বেশ কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনলেও বাজারের পতন না থামায় স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। তাছাড়া কমিশন বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় করতে প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে পারেনি।

শুধু তাই নয় বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাথে সমন্বয়হীনতাও বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করেছে। শুধু তাই নয় গত দেড় বছরে একটি নতুন কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত না হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগও উল্লেখ্যযোগ্য হারে কমেছে। এতে করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম আস্থার সংকট বিরাজ করছে।

এছাড়া গত ১৮ মাসে পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল করতে ব্যর্থ হওয়ায় নতুন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে বিনিয়োগকারীরা। তাদের মতে বিএসইসিতে রাজনৈতিক নিয়োগের পরিবর্তে পুঁজিবাজারে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।  গত ২২ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত সরকারের অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে বিনিয়োগকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমআইএ) সভাপতি এস এম ইকবাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম মানিক স্বাক্ষরিত একটি চিঠি দেওয়া হয়।

চিঠিতে বলা হয়, বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে পুঁজিবাজার উন্নয়ন গুরুত্ব পাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশা তৈরি হয়েছে। এর প্রতিফলন দেখা যায় নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম কর্মদিবসে, যখন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং লেনদেন সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। তবে সংগঠনটি বলছে বর্তমান কমিশনের নেতৃত্বে বাজারে প্রত্যাশিত স্থিতিশীলতা ও আস্থা তৈরি হয়নি।

পাশাপাশি বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে পুঁজিবাজারের উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য নিয়ন্ত্রক পদে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তারই ফলশ্রুতিতে নতুন কমিশন গঠন হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে বিএসইসির শীর্ষ পদে রাজনীতিবিদ বা ব্যবসায়ীদের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে। অভিজ্ঞতার অভাব থেকে উদ্ভূত ত্রুটিগুলি সততা, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং প্রচেষ্টার মাধ্যমে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারে চলমান অস্থিরতা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা এখন আলোচিত বিষয়। নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বিএসইসির শীর্ষ পদগুলোতে বসতে ইতিমধ্যে একাধিক ব্যাক্তির নাম আলোচনায় আসছে। এ নিয়ে জোর তদবিরও শুরু হয়েছে। তবে বাজারের উন্নয়নের স্বার্থে দক্ষ এবং সঠিক নেতৃত্ব অপরিহার্য বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এছাড়া নতুন সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বড় চাওয়া তাদের পুঁজির সুরক্ষা। ২০২৬ সালের শুরুতে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পুঁজিবাজার নিয়ে আশার আলো দেখা গেলেও তা স্থায়ী হয়নি। অর্থমন্ত্রীর কঠোর বার্তার পরেও বাজারে লেনদেনের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার ঘরে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, বর্তমান কমিশনের কাঠামোর মধ্যে থেকে আমূল পরিবর্তন সম্ভব নয়।

পুঁজিবাজার পরিস্থিতি নিয়ে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মূল সমস্যা আস্থার সংকট। তাই যে কোন মূল্যে বিনিয়োগকারীদের মাঝে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ বিএসইসির বিগত দুই কমিশনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ শোনা যায়। বর্তমান কমিশনের বিরুদ্ধে এখনো সেই ধরনের কোনো অভিযোগ শোনা না গেলেও গত ১৮ মাসে তিনি পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতা ফেরাতে পারেনি। মুলত তাদের অভিজ্ঞতায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

এ কারণে বর্তমান কমিশন অনেক উদ্যোগ নিলেও সেগুলোর ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া বিগত দুই কমিশনের সময় বাজারে আসা অনেক কোম্পানি এখন বাজারের জন্য বড় বোঝা বা বার্ডেন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব বার্ডেন দূর করতে না পারলে পুঁজিবাজারে স্বাভাবিক গতি ফিরে আসবে না।