স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের খাতের কোম্পানি বিডি অটোকার শেয়ার দর অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে বলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) তদন্তে উঠে এসেছে। ফলে কোম্পানিটিতে বিনিয়োগের আগে বিনিয়োগকারীদের সচেতন হওয়া উচিত বলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ মনে করছেন।

তবে পুঁজিবাজারের কিছু বিনিয়োগকারীর কাছে অনেকটাই রূপকথার ‘আলাদিনের চেরাগ’ হিসেবে দেখা দিয়েছে বিডি অটোকার। মাত্র এক মাসে কোম্পানিটির শেয়ার দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। তবে নতুন সরকার গঠনের এক মাস পেরিয়ে গেলেও পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি। তবে বাজার স্থিতিশীল না হলেও কারসাজি থেতে নেই।

তবে অভিযোগ রয়েছে বহুল আলোচিত কারসাজি চক্র শেয়ারটি নিয়ে কারসাজিতে মেতে উঠছেন। কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউজ থেকে নাম বেনামে শেয়ারটি নিয়ে কারসাজি চলছে। বিএসইসি তদন্ত করে কারসাজির আসল চিত্র বের হয়ে যাবে। মুলত বিডি অটোকার শেয়ারটি মাত্র এক মাসে প্রায় ১০০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি, সংখ্যাটি নিজেই বিস্ময়কর। গত ৮ মার্চ যেখানে কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ১২৬ টাকা ১০ পয়সা, সেখানে এক মাস পর ১৩ এপ্রিল তা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২৪৬ টাকা ৫০ পয়সায়। অর্থাৎ খুব অল্প সময়েই শেয়ারপ্রতি দাম বেড়েছে ১২২ টাকা।

আর পাঁচ মাসের ব্যবধানে এই বৃদ্ধির হার প্রায় ১৫০ শতাংশ। এই উত্থান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বাস তৈরি করেছে। কেউ কেউ অল্প সময়েই বড় অঙ্কের মুনাফা করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ৮ মার্চ কোম্পানিটির শেয়ারে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে বর্তমানে তার মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৫৪ হাজার ৭৯৭ টাকায়। অর্থাৎ এক মাসের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে সাড়ে ৯ লাখ টাকার বেশি মুনাফা।

আবার এই বিনিয়োগ যদি আরও একটু আগে হয়ে থাকে তাহলে মুনাফার পরিমাণ আরও আকর্ষণীয়। গত ১৩ নভেম্বর কোম্পানিটির প্রতটি শেয়ারের দাম ছিলো ৯৯ টাকা ৪০ পয়সা। যদি কোনো বিনিয়োগকারী সে সময় কোম্পানিটির ১০ লাখ টাকার শেয়ার কিনে ধরে রাখেন, তাহলে বর্তমানে তার বাজার মূল্য ২৪ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৯ টাকা।

অর্থাৎ ১০ লাখ টাকা পাঁচ মাস বিনিয়োগ করে মুনাফা হয়েছে ১৪ লাখ ৭৯ হাজার টাকার বেশি। এই মুনাফার হার ১৪৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এই মুনাফা অনেকের কাছে স্বপ্নের মতো। কিন্তু এই স্বপ্নের পেছনের বাস্তবতা কতটা শক্ত? এখানেই শুরু হয় প্রশ্ন। কোম্পানিটির সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা।

২০২৫ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছে মাত্র ৫ পয়সা। এই আয়ের ভিত্তিতে বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী কোম্পানিটির মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৬৫, যা শুধু অস্বাভাবিকই নয়, প্রায় অবাস্তব।

সহজভাবে বললে, কোম্পানির বর্তমান আয়ের ধারা অপরিবর্তিত থাকলে একজন বিনিয়োগকারীর তার বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পেতে সময় লাগবে দুই হাজার ৪৬৫ বছর বেশি। পুঁজিবাজারের বাস্তবতায় এমন হিসাব কার্যত সতর্ক সংকেত হিসেবেই বিবেচিত হয়। তাহলে প্রশ্ন ওঠে এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে কী আছে? বাজার বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এর পেছনে থাকতে পারে ‘বিশেষ চক্র’ বা সংগঠিত বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর প্রভাব।

বাংলাদেশ অটোকারসের মোট শেয়ার সংখ্যা মাত্র ৪৩ লাখের কিছু বেশি। ফলে তুলনামূলক কম মূলধন দিয়েই শেয়ারটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কৃত্রিমভাবে চাহিদা তৈরি করে দাম বাড়ানোর অভিযোগ নতুন নয়।

আরও একটি বিষয় বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তা হলো কোম্পানির লভ্যাংশ ইতিহাস। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোম্পানিটি মাত্র ২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। যদিও আগে কিছু বছর ৪ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছিল, তবুও তা বিনিয়োগকারীদের জন্য খুব আকর্ষণীয় নয়। এই বাস্তবতার সঙ্গে বর্তমান শেয়ারদরের উল্লম্ফন যেন কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ইতোমধ্যে কোম্পানিটিকে এ বিষয়ে নোটিশ দিয়েছে। তবে জবাবে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শেয়ারদর বৃদ্ধির পেছনে কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই। ফলে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে, যদি মৌলভিত্তিতে পরিবর্তন না ঘটে, তবে এই উত্থান কেন?

ডিএসইর এক সদস্য বলেন, আমরা হিসাবে করে দেখেছি পরিচালকদের শেয়ার বাদ দিয়ে কোম্পানিটির সব শেয়ার কিনতে কিছুদিন আগে লাগতো ৩০-৪০ কোটি টাকার মতো। অর্থাৎ ৩০ কোটি টাকা দিয়েই কোম্পানিটির শেয়ারে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ আসা সম্ভব। আর বর্তমানে দাম বিবেচনায় নিলে ৬০-৭০ কোটি টাকা দিয়েই কোম্পানিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

এ ধরনের কোম্পানির শেয়ারে গুটি কয়েক বিনিয়োগকারীর পক্ষ যোগসাজশ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা এবং দাম বাড়ানো সম্ভব। অটোকারের শেয়ার দাম বাড়ার পিছনে এমন কোনো ঘটনা আছে কি না, তা ক্ষতিয়ে দেখা উচিত। কোনো বিশেষ গ্রুপের ভূমিকা না থাকলে এভাবে শেয়ার দাম বাড়ার কথা না।

১৯৮৮ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন মাত্র ৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা। আর শেয়ার সংখ্যা ৪৩ লাখ ২৬ হাজার ১৩টি। এর মধ্যে ৩০ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ শেয়ার আছে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের কাছে। বাকি শেয়ারের মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৪৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ২১ দশমিক ৯৮ শতাংশ শেয়ার আছে।