বসুন্ধরা পেপার মিলসের ২১ মাসে ৭৫২ কোটি টাকা লোকসান
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কাগজ ও প্রকাশনা খাতের কোম্পানি সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস যেখানে ভালো মুনাফা ও লভ্যাংশ দিয়ে ব্যবসায়িক সফলতা ধরে রেখেছে, সেখানে একই খাতের কোম্পানি বসুন্ধরা পেপার মিলস অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে। ডলার সংকটে লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খুলতে না পারায় কাঁচামাল আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ভয়াবহ উৎপাদন ও ব্যবসায়িক মন্দার কবলে পড়ে গত ২১ মাসে কোম্পানিটির প্রায় ৭৫২ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
একই গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আরেক কোম্পানি মেঘনা সিমেন্টও ভয়াবহ সংকটে রয়েছে। ঋণখেলাপি হওয়ায় এলসি খুলতে পারছে না কোম্পানিটি, বন্ধ হয়ে গেছে কাঁচামাল আমদানি। ফলে মাত্র তিন বছরের মধ্যেই ৩২ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের এই কোম্পানির লোকসান দাঁড়িয়েছে ২৯০ কোটি টাকায়। এ পরিস্থিতিতে কোম্পানিটির ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষক।
বসুন্ধরা পেপারের ব্যবসায়িক মন্দা প্রসঙ্গে নিরীক্ষক জানিয়েছেন, কাঁচামাল সংকটের কারণে আগের অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানির পণ্য বিক্রি তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমেছে। ডলার সংকটে এলসি খুলতে না পারায় কোম্পানিটির স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কোম্পানিটির পণ্য বিক্রির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩১৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৪ শতাংশ বা ৭১২ কোটি ১২ লাখ টাকা কমে দাঁড়ায় ৬০৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকায়।
উৎপাদন কমে গেলেও কোম্পানিটির কিছু স্থায়ী ব্যয় আগের মতোই রয়েছে। মেশিনারিজের ব্যবহার কমে যাওয়া, স্থায়ী ওভারহেড ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির কারণে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিতে উৎপাদন ব্যয় আনুপাতিক হারে অনেক বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন ব্যয়ের হার ছিল ৮০.৬১ শতাংশ, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ৯৩.৮৯ শতাংশে দাঁড়ায়।
উচ্চ মূল্যে শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ২০১৮ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া বসুন্ধরা পেপার গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ে। ওই অর্থবছরে কোম্পানিটির ৩২৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা লোকসান হয়, যেখানে শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ১৮.৯৮ টাকা।
চলতি অর্থবছরেও এই নেতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। প্রথম ৯ মাসে (জুলাই ২০২৫-মার্চ ২০২৬) কোম্পানিটির নিট লোকসান হয়েছে ৪২১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা (শেয়ারপ্রতি ২৪.২৭ টাকা)। সব মিলিয়ে ১৭৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের এই কোম্পানির গত ২১ মাসে মোট লোকসানের পরিমাণ ৭৫১ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
অথচ একই সমজাতীয় পণ্যের ব্যবসা করে সোনালী পেপার ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ৭.১৭ টাকা মুনাফা করেছে এবং বিনিয়োগকারীদের ৪০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। আকর্ষণীয় ব্যবসায়িক পারফরম্যান্স দেখিয়ে ২০১৮ সালে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রতিটি শেয়ার ৮০ টাকা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৭২ টাকা দরে ইস্যুর মাধ্যমে বাজার থেকে ২০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল বসুন্ধরা পেপার।
ইস্যু ম্যানেজার এএএ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে বাজারে আসা কোম্পানিটির কাট-অফ প্রাইস অতিমূল্যায়িত হওয়া নিয়ে শুরুতেই বিতর্ক ছিল। অভিযোগ রয়েছে, কিছু যোগ্য বিনিয়োগকারীর কৃত্রিম সহযোগিতায় এই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়নের পর কোম্পানিটির উৎপাদন ক্ষমতা ৩০ হাজার মেট্রিক টন বাড়লেও এখন তারা বিশাল লোকসানের বৃত্তে বন্দি।



