পুঁজিবাজারে সুশাসন জোরদারে নতুন বিধিমালা করছে বিএসইসি
মেহেদী হাসান, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর দীর্ঘদিনের সুশাসন সংকট, আর্থিক অনিয়ম ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার প্রেক্ষাপটে নতুন করপোরেট গভর্নেন্স বিধিমালা আনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ‘করপোরেট গভর্ন্যান্স বিধিমালা ২০২৬’ এর খসড়ায় যুক্ত করা হয়েছেবার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম), ডিভিডেন্ড বিতরণ, স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ, পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব ও আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয়ে নতুন নির্দেশনা।
গত বৃহস্পতিবার বিএসইসির ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ওই খসড়া বিধিমালার ওপর মতামত, পরামর্শ বা আপত্তি জানাতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান করা হয়েছে। বিএসইসির মতে, নতুন বিধিমালার মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী হবে। আগে কোম্পানিগুলোর সুশাসন নিশ্চিতে গাইডলাইন আকারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া ছিল। এখন করপোরেট গভর্ন্যান্স সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা বাড়ানো। প্রস্তাব অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোম্পানির বোর্ডে স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা মোট পরিচালকের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ অথবা ন্যূনতম তিনজন যেটি বেশি হবে- সেই অনুপাতে নির্ধারণ করতে হবে। হিসাবের ক্ষেত্রে ভগ্নাংশ এলে তা পরবর্তী পূর্ণসংখ্যায় পূর্ণ করার নির্দেশনা রয়েছে। একই অনুপাত প্রযোজ্য হবে সাবসিডিয়ারি কোম্পানির ক্ষেত্রে।
স্বতন্ত্র পরিচালকদের যোগ্যতা নির্ধারণে বিস্তারিত মানদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিধি অনুযায়ী, সাধারণভাবে স্বতন্ত্র পরিচালককে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অন্তত ১২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তবে নারী স্বতন্ত্র পরিচালকদের জন্য অভিজ্ঞতার সীমা ৮ বছর নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত বা বড় কোম্পানির পরিচালক, শীর্ষ পর্যায়ের নির্বাহী, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, চার্টার্ড সেক্রেটারি ও আইনজীবীর মতো পেশাজীবীরা এ পদে থাকতে পারবেন।
বিধিমালায় তথ্য প্রকাশ ও প্রতিবেদন ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। খসড়া বিধি অনুয়ায়ী, কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে অতিরিক্ত বিবরণী যুক্ত করতে হবে। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে (সিইও) একটি ‘ম্যানেজমেন্ট ডিসকাশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস’ প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করতে হবে। এতে কোম্পানির আর্থিক ফলাফল, তারল্য, মূলধন সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য থাকতে হবে।
বোর্ড মিটিংয়ের নোটিশ, কার্যবিবরণী ও উপস্থিতির রেকর্ড সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। রেকর্ড ডেটের ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে এজিএম করতে হবে। এক্ষেত্রে সভার নোটিশ কমপক্ষে ২১ দিন আগে শেয়ারহোল্ডার ও স্টক এক্সচেঞ্জে পাঠানোর বিধান রাখা হয়েছে। লভ্যাংশ বণ্টনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনুমোদনের ৩০ দিনের মধ্যে লভ্যাংশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে ঘোষিত সভার অন্তত এক দিন আগে পৃথক ব্যাংক হিসাব খুলে নগদ লভ্যাংশ সেখানে স্থানান্তরের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আগে অডিট ও নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনারেশন কমিটি বাধ্যতামূলক থাকলেও নতুন বিধিমালায় রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে খরচ কমাতে চাইলে অডিট কমিটিকেই রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিটির দায়িত্ব পালনের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রথমবারের মতো যুক্ত করা হয়েছে পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসন (ইএসজি) রিপোর্টিংয়ের বিষয়টি। খসড়া বিধি অনুযায়ী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কোম্পানি সচিব, প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রধান পদে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি নিয়োগ দিতে হবে। তারা কমিশনের পূর্বানুমতি ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানিতে নির্বাহী পদে থাকতে পারবেন না।
কমপ্লায়েন্স তদারকিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রতি বছর ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশের তালিকাভুক্ত কোনো ফার্ম থেকে কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেট নিতে হবে। যে চার্টার্ড সেক্রেটারি এই সনদ দেবেন, তাকে শেয়ারহোল্ডারদের প্রশ্নের উত্তর দিতে এজিএমে উপস্থিত থাকতে হবে।
এ বিষয় বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, কোম্পানিগুলোতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে কমিশন একটা বিধিমালার প্রস্তাব করেছে। জনগণের মতামত এবং পরামর্শ আহ্বান করা হয়েছে। অংশীজনদের মতামত ও তাদের সঙ্গে সভা করে এটা চূড়ান্ত করে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।



