ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স অনিয়ম উদ্ঘাটনে ব্যর্থ নিরীক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে বিমা খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের পাঁচ বছরের আর্থিক প্রতিবেদনে একাধিক গুরুতর অনিয়ম ও তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়ম যথাযথভাবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান এম. জে. আবেদিন অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস এর এনগেজমেন্ট পার্টনার কামরুল আবেদিন। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলকে (এফআরসি) অনুরোধ জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
সূত্রে জানা গেছে, ডেল্টা লাইফের ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের আর্থিক বছরের বিশেষ নিরীক্ষায় যেসব গুরুতর অনিয়ম উঠে এসেছে, সেগুলো কোম্পানির নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান যথাযথভাবে শনাক্ত ও আর্থিক প্রতিবেদনে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে। সে সময় কোম্পানিটির নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করে ম্যাব অ্যান্ড জে পার্টনার্স চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস। আর সেই নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অসঙ্গতিগুলো নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছেন এম. জে. আবেদিন অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস এর এনগেজমেন্ট পার্টনার কামরুল আবেদিন।
অভিযোগ রয়েছে, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স অনিষ্পন্ন দাবির বিপরীতে কম সঞ্চিতি রেখে মুনাফা ও শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) অতিরঞ্জিত করে দেখিয়েছে। এছাড়া কোম্পানিটি গাড়ি ক্রয়ের ক্ষেত্রে নিজস্ব নীতিমালা মানেনি, অ্যাকচ্যুয়ারিয়াল মূল্যায়নের উদ্বৃত্ত স্থিতিপত্রের (ব্যালেন্স শিট) ইক্যুইটি অংশে দেখানো হয়নি, কোম্পানিটির অধিকাংশ শেয়ার একই পরিবারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং পর্যাপ্ত নিরীক্ষা প্রমাণ ছাড়াই অপরিবর্তিত মতামত দিয়েছে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান।
এসব অসঙ্গতির পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিএসইসির কমিশন সভায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় বিশেষ নিরীক্ষায় উদ্ঘাটিত একাধিক লঙ্ঘনের বিষয় নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রতিফলিত না হওয়ায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এফআরসিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
কমিশন মনে করে, কোম্পানির নিরীক্ষক গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক অসঙ্গতি শনাক্ত করলেও তা নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করেননি। এর ফলে বিনিয়োগকারী, শেয়ারহোল্ডার এবং সাধারণ মানুষ কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার বিষয়ে বিভ্রান্ত হয়েছেন।
সূত্রে জানা গেছে, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স ১২৪ কোটি ২ লাখ টাকার অনিষ্পন্ন বিমা দাবির বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখেনি। ফলে কোম্পানির মুনাফা এবং ইপিএস প্রকৃত অবস্থার চেয়ে বেশি দেখানো হয়েছে বলে মনে করছে কমিশন। এছাড়া ৬ কোটি ৫১ লাখ টাকার ৩০টি গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে কোম্পানির নিজস্ব ক্রয়নীতি অনুসরণ করা হয়নি বলেও বিশেষ নিরীক্ষায় উঠে এসেছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো: ২৫৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকার অ্যাকচ্যুয়ারিয়াল মূল্যায়নের উদ্বৃত্ত কোম্পানির স্থিতিপত্রের ইক্যুইটি অংশে দেখানো হয়নি। ফলে কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে কোম্পানির মোট ইস্যুকৃত শেয়ারের ২২.৭৭ শতাংশ একই পরিবারের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে থাকার বিষয়টিও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হিসেবে বিএসইসি বলছে, পর্যাপ্ত নিরীক্ষা প্রমাণ ছাড়াই কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে আনমডিফায়েড অপিনিয়ন বা অপরিবর্তিত মতামত দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান আর্থিক প্রতিবেদনে কোনো বড় অসঙ্গতি নেই বলে মতামত দিলেও পরবর্তী বিশেষ নিরীক্ষায় একাধিক গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ঘটনা শুধু একটি বিমা কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন নয়; বরং দেশের করপোরেট নিরীক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেও নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
বিশেষ করে তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করেই সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে নিরীক্ষকের ব্যর্থতা বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে পুঁজিবাজারে আর্থিক প্রতিবেদনভিত্তিক স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ, আর্থিক প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতা নষ্ট হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেছেন, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদনে অসঙ্গতির পরিপ্রেক্ষিতে নিরীক্ষকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এফআরসিকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এফআরসি কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, সেটা দেখে কমিশন পরবর্তীতে পদক্ষেপ নেবে।



