স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বছরের পর বছর অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ, রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ অনুমোদন, দুর্বল তদারকি এবং খেলাপি ঋণের লাগামহীন বিস্তারের ফলে ব্যাংকগুলোর মূলধন সংকট এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলমান সংকটে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু সাতটি ইসলামী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা পুরো ব্যাংক খাতের সংকটকে আরও গভীর করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তিন মাস আগে পরিস্থিতি আরও খারাপ ছিল। সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের সংখ্যা ছিল ২৩টি এবং মোট ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সামান্য উন্নতি বাস্তব চিত্র নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃতফসিল নীতির কারণে কাগজে-কলমে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো দেখাচ্ছে।

ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বলতে বোঝায়, কোনো ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন ও সংরক্ষিত তহবিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে যাওয়া। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু দেশের ব্যাংক খাতে সেই মানদণ্ড এখন অনেক দূরে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্যাংক খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক ক্যাপিটাল টু রিস্ক ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (সিআরএআর) ডিসেম্বর শেষে নেমে এসেছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে। অথচ আন্তর্জাতিকভাবে এই হার ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকার কথা।

বিশ্লেষকদের মতে, ভয়াবহ এই পরিস্থিতির মূল কারণ খেলাপি ঋণ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এত বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে গিয়ে ব্যাংকগুলোর মূলধনের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

এর মধ্যে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকার বেশি। এসব ব্যাংকগুলোর মধ্যে জনতা ব্যাংকের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি—২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংকের ৬ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের ৪ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো। সাতটি ইসলামী ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি একাই ৬৪ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। এছাড়া সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকেও বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এবং আইসিবি ইসলামী ব্যাংকও মূলধন সংকটে রয়েছে। বেসরকারি খাতের কয়েকটি ব্যাংকেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকসহ সাতটি বেসরকারি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে বিশেষায়িত খাতের বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকও বড় ধরনের মূলধন সংকটে ভুগছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কিছু খেলাপি ঋণ নিয়মিত দেখানো হয়েছে। ফলে এসব ঋণের বিপরীতে কম প্রভিশন রাখতে হয়েছে এবং এতে মূলধনের ওপর চাপ কিছুটা কমেছে। তবে ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি মূলত সাময়িক ও কাগুজে সমাধান। প্রকৃত আর্থিক অবস্থার কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন, দুর্বল পরিচালনা ব্যবস্থা এবং বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার ফল এখন পুরো ব্যাংক খাতকে বহন করতে হচ্ছে। একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারি ব্যাংকগুলোর ভেতরের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল করে দিয়েছে।

মূলধন সংকট বাড়তে থাকলে ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাবে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক লেনদেন ও বৈদেশিক অর্থায়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।