স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশে ও বিদেশে থাকা অপ্রদর্শিত সম্পদ বা অর্থ বৈধ করার জন্য আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিশেষ কর সুবিধা চালুর কথা বিবেচনা করছে সরকার। বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটানো এবং অচল মূলধন অর্থনীতির মূলধারায় আনতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হবে।

গত এপ্রিলে প্রাক-বাজেট আলোচনায় আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন না করার প্রস্তাব দেয় রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। এক্ষেত্রে সংগঠনটি আয়কর অধ্যাদেশের পুরোনো ধারা (১৯ বিবিবিবিবি) পুনঃপ্রবর্তনের দাবি জানায়।

বাংলাদেশে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রথম দেওয়া হয় ১৯৭৫ সালে সামরিক আইনের অধীনে। এরপর বিভিন্ন সরকার সময়ে সময়ে এ সুবিধা অব্যাহত রাখে। সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৭-০৮ ও ২০০৮-০৯ অর্থবছরে প্রায় ৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা বৈধ করা হয়, যা তখন পর্যন্ত ছিল সর্বোচ্চ।

পরে ২০২০-২১ অর্থবছরে ১০ শতাংশ কর দিয়ে প্রায় ১১ হাজার ৮৩৯ জন ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বৈধ করেন, যা দেশের ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ। এতে এনবিআর ২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা রাজস্ব পায়। এছাড়া ২০২১-২২ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সাড়ে ৭ শতাংশ কর দিয়ে বিদেশে থাকা অঘোষিত অর্থ দেশে আনার সুযোগ দেওয়া হয়।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ শতাংশ কর পরিশোধ করলে বিনা প্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থ, নগদ টাকা ও শেয়ারসহ যে কোনো বিনিয়োগ ঢালাওভাবে বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। গত অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ফ্ল্যাট ও ভবনে বিনিয়োগ করে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রেখেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে সমালোচনার মুখে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার। ওই বাজেটে অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাট এবং ভবন কেনায় কালো টাকা সাদা করার সুযোগ অব্যাহত রাখা হয়।

তবে আগের চেয়ে করের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছিল। বলা হয়, এলাকাভেদে আয়তন অনুসারে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিলেই টাকার উৎস সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে বলে ধরে এনবিআর। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভাগীয় শহর, জেলা শহর, পৌর এলাকাভেদে প্রতি বর্গফুটে ১০০ থেকে দুই হাজার টাকা করহারের প্রস্তাব ছিল। এছাড়া একই সুবিধা পেতে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এলাকাভেদে প্রতি বর্গফুটে ৫০ থেকে ৯০০ টাকা কর নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হয়েছিল।

এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আওতায় নির্ধারিত কিছু খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে অপ্রদর্শিত দেশীয় ও বিদেশি সম্পদ বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে নিয়মিত করদাতাদের তুলনায় বেশি হারে কর দিতে হবে। কর্মকর্তারা জানান, এবার আগের মতো ‘সাধারণ ক্ষমা’ নয়, বরং তুলনামূলক বেশি করহার আরোপ এবং উৎপাদনশীল খাতে সীমিত সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণের চেষ্টা করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, এটির উদ্দেশ্য কর ফাঁকিদাতাদের পুরস্কৃত করা নয়, বরং অপ্রদর্শিত ও অচল অর্থকে উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনা। বর্তমানে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের উচ্চ সুদহার এবং বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতির কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেছে।

এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা অর্থ কিংবা বিদেশে থাকা সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে চায় সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য তিনটি দেশে বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়ানো, দীর্ঘদিন ধরে স্থবির থাকা আবাসন খাত চাঙা করা এবং বিদেশে থাকা অপ্রদর্শিত সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনা। এছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে হওয়া রাজস্ব ও আর্থিক সংস্কার-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেও সরকার রাজস্ব আহরণ বাড়াতে চায়।

এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি মূলত দুই ধরনের সম্পদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। প্রথমত, বিদেশে থাকা অপ্রদর্শিত অর্থ বা সম্পদ দেশে ফিরিয়ে নির্ধারিত খাতে বিনিয়োগ করলে নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে তা বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। তবে করের হার নিয়মিত করদাতাদের তুলনায় বেশি রাখা হবে, যাতে কর ব্যবস্থার ন্যায্যতা বজায় থাকে।

দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে মন্দায় থাকা আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হতে পারে। আবাসিক ফ্ল্যাট, বাণিজ্যিক ভবন বা অন্যান্য স্থাবর সম্পদে বিনিয়োগ এ সুবিধার আওতায় আসতে পারে। তবে অর্থের উৎস, বিনিয়োগের ধরন এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে করের হার ভিন্ন হতে পারে।

সূত্রগুলো বলছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে করের হার তুলনামূলক বেশি হতে পারে। অন্যদিকে শিল্পাঞ্চল বা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগে তুলনামূলক কম হার নির্ধারণের চিন্তা রয়েছে। এছাড়া আয়কর আইনের ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও রপ্তানিমুখী শিল্পসহ কিছু উৎপাদনমুখী খাতের জন্য নতুন প্রণোদনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে এর আগেও একাধিকবার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে অতীতে এসব উদ্যোগ সমালোচিত হয়েছিল, কারণ অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত করদাতাদের তুলনায় কম হারে কর দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের নীতি কর ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ও কর প্রদানের সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, যদি নিয়মিত কর ফাঁকিদাতাদের বারবার সুযোগ দেওয়া হয় আর সৎ করদাতারা তুলনামূলক বেশি চাপের মুখে পড়েন, তাহলে তা কর ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর বার্তা দেয়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর বলেন, এ সুযোগ সৎ করদাতার ওপর নৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। করদাতা অসহায় বোধ করেন। তবে প্রসিডিউরাল কারণে অনেক সময় বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স ও সম্পদ বিক্রির ফলে কিছু অপ্রদর্শিত অর্থ সৃষ্টি হয়। অর্থনীতির স্বার্থে যদিও এ বছর এই সুযোগ রাখা হয় তবে সেখানে একটা টাইমলাইনও দিয়ে দিতে হবে।

এ সুযোগ খুব বেশিদিন রাখা ঠিক হবে না। পাশাপাশি এনবিআরকে এটা জানাতে হবে কতজন করদাতা এ সুযোগ নিলো। কেননা অতীতে আমরা দেখেছি অপ্রদর্শিত অর্থ ফেরতের সুযোগ দেওয়া হলেও বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আসেনি। বারবার অসৎ করদাতারা এটার সুযোগ নিতে চাইবে। এ কারণে এই সুযোগ নিয়ে সরকারের আরও যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ আছে বলেও জানান তিনি।