স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: কাগুজে প্রতিষ্ঠান খুলে ব্যাংক থেকে অর্থ সরানোই তার মূল লক্ষ্য। ব্যাংকিং এবং নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কখনও শেয়ার কিনে, কখনও ডিরেক্টরশিপ নিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেন তিনি। প্রতারণা, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ লোপাটই তার নেশা। এ হেন এই লুটেরার নাম শহীদুল আহসান। ‘আহসান গ্রুপ’ তথা এজি গ্রুপ’র কর্ণধার হিসেবেই যিনি সমধিক পরিচিত। শেখ হাসিনার শাসনামলের সময় কতিপয় ব্যক্তিকে সামনে রেখে তিনি গত দেড় দশক ধরে চালিয়ে যাচ্ছেন লুটপাট। এই সময়ের মধ্যে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন শত শত কোটি টাকা।

লুণ্ঠিত অর্থের সামান্য কিছু দেশে বিনিয়োগ দেখিয়ে পুরো অর্থই পাচার করেন বিভিন্ন দেশে। শহীদুল আহসান এবং তার ভাইদের অর্থ লোপাটের বিষয়টি বহু আগেই ধরা পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি ইউনিট-বিএফআইইউ। তার আর্থিক অপরাধের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তে সংস্থাটি বহু আগেই প্রতিবেদন পাঠায়। কিন্তু অদৃশ্য ইশারায় শহীদুল আহসানের টিকিটিও স্পর্শ করেনি কোনো সংস্থা।

তথ্যানসুন্ধানে জানা যায়, নোয়াখালিতে জন্ম দেশের অর্থনৈতিক খাতের লুটেরা শহীদুল আহসানের। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত প্রোফাইলে রয়েছে তার ব্যক্তি জীবন সংক্রান্ত ইতিবাচক সব তথ্য। যেমন তার বায়োডাটায় উল্লেখ রয়েছে, শহীদুল আহসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ধীরে ধীরে নিজেকে শিল্পপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন শহীদুল আহসান।

আই-পে সিস্টেম, আহসান গ্রুপ ও প্রিয় ডটকমের চেয়ারম্যান শহীদুল আহসান সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন ডিবিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ডেইলি অবজারভারের পরিচালক-ইত্যাদি ইত্যাদি। মূলত: ব্যাংকিং ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে শত শত কোটি টাকা লুণ্ঠনই তার নেশা ও পেশা। প্রতারণা, জালিয়াতি, ব্যাংক লুটের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আড়াল করতেই তিনি কোথাও তিনি ‘শিল্পপতি’, ‘ব্যবসায়ী’, কোথাওবা ‘মিডিয়া মুঘল’ হিসেবে পরিচয় দেন। অপরাধ আড়াল করতেই বাদ বাকি পরিচয়গুলোকে কাজে লাগান এজি গ্রুপের মালিক শহীদুল আহসান।

শহীদুল আহসানের আবির্ভাব হয় বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় নিজেকে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের ঘনিষ্ঠজন পরিচয়ে গর্ব বোধ করতেন। যদিও ব্যরিস্টার মওদুদও তাকে খুব একটা পাত্তা দিতেন না। স্বার্থের টানাপড়েনে এক সময ব্যারিস্টার মওদুদ এবং শহীদুল আহসানের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়। শহীদুল যোগাযোগ শুরু করেন আওয়ামী লীগের তৎকালিন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের সঙ্গে।

একপর্যায়ে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালকও হন। আবদুল জলিল বাণিজ্যমন্ত্রী থাকাকালে শহীদুল বিভিন্ন বাণিজ্যিক কোটা নিয়ন্ত্রণ করতেন। আব্দুল জলিলকেও কেনাবেচনা করতেন। এ ঘটনা আব্দুল জলিলের কাছে ধরা পড়ে গেলে শহীদুল আহসানকে দূরে সরিয়ে দেন। এক পর্যাযে পরিচালক পদ থেকেও বাদ দেয়া হয় শহীদুল আহসানকে।

এরপর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স’। সেখানেও তার নানা ধরণের অনিয়ম-দুর্নীতি চলতে থাকে। একপর্যায়ে আব্দুল জলিলের হাতেপায়ে ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। জলিল তাকে ক্ষমা করলে শহীদুল পুনরায় মার্কেণ্টাইল ব্যাংকের পরিচালক পদে আসীন হন। এরপর থেকে শুরু হয় তার নামে বেনামে ঋণ জালিয়াতি। ঋণ জালিয়াতি সম্পর্কে শহীদুল আহসানের কোনো রাখঢাকও নেই। তার কথা স্পষ্ট। বলেন, যারা আমাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উত্থাপন করেছে তাদের বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশ দিচ্ছি।

ফলে ব্যাংক খাতে নানা আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগে আলোচিত দুই প্রভাবশালী ব্যক্তিকে ঘিরে ফের নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, অতীতে বিভিন্ন ব্যাংককে সংকটে ফেলায় অভিযুক্ত এই দুই ব্যক্তি আবারও আর্থিক খাতে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাব বিস্তারে তারা নানাভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন এবং নীতি-নির্ধারণী পর্যায়েও যোগাযোগের চেষ্টা করছেন।

দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যম অঙ্গনেও তাদের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। এই দুই ব্যক্তির একজন মো. শহীদুল আহসান। অন্যজন এ কে এম সাহিদ রেজা। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে বিনিয়োগের উদ্যোগ নিলেও তিনি বড় পরিসরে সফল হতে পারেননি। একসময় তিনি ইংরেজি দৈনিক অবজারভার-এর পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি তার মালিকানাধীন বাংলা রেডিওও রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, তারা দুজনই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ মহলে ছিলেন এবং আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযুক্ত পি কে হালদারের সঙ্গেও তাদের সম্পৃক্ততার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেও নানা অনিয়মের তথ্য রয়েছে বলে জানা যায়। এমনকি আর্থিক খাতে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, প্রায়ই ছোটখাটো অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বড় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না। তাদের ভাষ্য, অতীতে বিতর্কিতদের আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা হলে তা খাতটির জন্য উদ্বেগজনক বার্তা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

অভিযোগ রয়েছে, ফলিকন স্টাইলিশ গার্মেন্টসের নামে এনআরবিসি ব্যাংক থেকে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ডিবিসি টেলিভিশনের মালিকানা কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ততা তৈরি হয়। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে টেলিভিশনটিকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। যদিও পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে বলে অনেকে মনে করেন।

তবে শহীদুল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বলা হচ্ছে, অতীতে নানা অনিয়মের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করলেও তিনি এখনও প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছেন। সম্প্রতি মার্কেন্টাইল ব্যাংক ও মেঘনা ব্যাংকেও পুনরায় প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে বলে আলোচনা রয়েছে।

মো. শহীদুল আহসান এজি অ্যাগ্রো ফুডস, আহসান গ্রুপ, এজি প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। একই সঙ্গে তিনি মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যানও ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তার কর্মকাণ্ডের কারণে একসময় মার্কেন্টাইল ব্যাংক এবং পরবর্তীতে এনআরবিসি ব্যাংকও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে উঠে আসে, এনআরবিসি ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়ম ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, আহসান গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বেগমগঞ্জ ফিড মিলস লিমিটেডের নামে ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব খাটানো হয়। পরে সেই ঋণের অর্থ বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের অভিযোগও ওঠে।

সূত্রের দাবি, একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রায় ৩০১ কোটি টাকা বিভিন্ন কৌশলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এতে নতুন প্রজন্মের ব্যাংক এনআরবিসি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে। অথচ শহীদুল আহসান আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাংকটির একজন গ্রাহক হলেও পরিচালনা পর্যায়ে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতেন বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আইন অমান্য করে ঋণ গ্রহণ, বেনামি শেয়ার ক্রয় এবং পরিচালনা পর্ষদের সভায় অননুমোদিত উপস্থিতির মতো অভিযোগও ছিল তার বিরুদ্ধে। একই সময়ে তিনি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবির ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন।

এদিকে শুধু এনআরবিসি নয়, আরও কয়েকটি ব্যাংক থেকে এজি অ্যাগ্রোর নামে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ঋণ নিয়ে এনআরবিসিতে বেনামি শেয়ার কেনার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সন্দেহ ছিল, এজি অ্যাগ্রোর ঋণের কিস্তি পরিশোধের অর্থও এসেছে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঋণ হিসাব থেকেই। এসব কার্যক্রমে তৎকালীন প্রভাবশালী ব্যাংক ব্যক্তিত্বদের সহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে।

অন্যদিকে, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এ কে এম সাহিদ রেজার বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২১ সালের ২৭ এপ্রিল তাকে ব্যাংক খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দায়িত্ব পালনে নিষিদ্ধ করে। একই সঙ্গে তাকে পরিচালকের পদ থেকেও অপসারণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, পি কে হালদারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণের অর্থ থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা সাহিদ রেজার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জমা হয়েছিল।

এ বিষয়ে দুদকের কাছেও তথ্য-প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করা হয়। এদিকে দেশের আর্থিক খাতে দীর্ঘদিনের সংকটের প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি পাঁচটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্টদের মতে, অতীতের এসব অনিয়ম ও অর্থ লুটের প্রভাব এখনও পুরো খাত বহন করছে।