স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বাজারে বহুজাতিক ও বড় কোম্পানি টানতে নীতিমালা করছে বিএসইসি দেশের অনেক বহুজাতিক ও বড় মূলধনের কোম্পানি এখনও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি। ব্যাংক ঋণের সহজলভ্যতার কারণে মূলধন সংগ্রহের জন্য এসব কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আসতে হয় না। তাই দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংক ঋণ সীমিত করা এবং অতালিকাভুক্ত বড় কোম্পানিগুলোতেও সুশাসন নিশ্চিত করার দাবি ছিল সংশ্লিষ্টদের। এমন প্রেক্ষাপটে অতালিকাভুক্ত বড় কোম্পানিকে সুশাসন ও জবাবদিহির আওতায় আনতে ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানি’ (পিআইসি) নামে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকার লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের শেয়ার রয়েছে এমন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনার উদ্যোগ নেয়।

এ সময় প্রাথমিকভাবে ১০টি প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্তির আলোচনায় আনা হয়। এর মধ্যে ছিল কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো), নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস, সিনজেনটা বাংলাদেশ, ইউনিলিভার বাংলাদেশ, সিনোভিয়া বাংলাদেশ, নোভার্টিস বাংলাদেশ ও নেসলে বাংলাদেশ। তবে শেষ পর্যন্ত এসব কোম্পানি আর তালিকাভুক্ত হয়নি।

বিএসইসি বলছে, নতুন নীতিমালার মাধ্যমে একটি ‘পুশ বাটন’ তৈরি করা হবে যার মাধ্যমে সুশাসনের কাঠামো নির্ধারণ করে আইপিও বা সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য কোম্পানিগুলোকে উৎসাহ দেওয়া হবে। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে এসব কোম্পানির আর্থিক তথ্য প্রকাশ, সুশাসন ও জবাবদিহি আরও জোরদার হবে। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি, স্টক ব্রোকার, স্টক ডিলার, মার্চেন্ট ব্যাংক ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধীরে ধীরে পিআইসি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তালিকাভুক্ত সব কোম্পানিও এই শ্রেণিতে থাকবে।

এর বাইরে নির্দিষ্ট আর্থিক সীমা অতিক্রম করলেও কোনো কোম্পানি পিআইসির আওতায় আসবে। খসড়া কাঠামো অনুযায়ী, ৫ কোটি টাকার বেশি পরিশোধিত মূলধন থাকা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি, ১৫ কোটি টাকার বেশি মূলধন থাকা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি, বছরে ১০০ কোটি টাকার বেশি আয় করা কোম্পানি এবং ব্যাংক বা অন্যান্য উৎস থেকে ২০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে পিআইসি হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।

বিএসইসি সূত্র বলছে, বড় মূলধনের কোম্পানিগুলোকে ধাপে ধাপে পুঁজিবাজারমুখী করার পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রায় ৫০ কোটি টাকার বেশি মূলধনের কোম্পানিকে আইপিওর মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার ছাড়তে হতে পারে। অন্যদিকে ৫ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার মূলধনের কোম্পানিগুলোকে কোয়ালিফায়েড ইনভেস্টর অফারের (কিউআইও) মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের সুযোগ দেওয়া হতে পারে।

প্রাথমিকভাবে সুশাসন নিশ্চিত করতে পিআইসিভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব ওয়েবসাইট চালু রাখা, নিয়মিত তথ্য প্রকাশ, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের মতো শর্ত পূরণ করতে হবে। একইসঙ্গে তাদের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য উৎসাহ দেওয়া হবে। প্রস্তাবিত নীতিমালায় অনানুষ্ঠানিকভাবে জনসাধারণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ বন্ধে প্রাইভেট প্লেসমেন্টে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ২০ জনে সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশে ব্যবসা পরিচালনা করে মুনাফা অর্জন করলেও অনেক বড় ও বহুজাতিক কোম্পানির আর্থিক ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ সীমিত। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও এসব কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যায়নি। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মূলধন সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাধারণ সম্পাদক সুমিত পোদ্দার বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। কিন্তু আমাদের দেশে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আসতে চায় না। মুনাফা, মূলধন ও ঋণসীমার মতো বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোও পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহিত হতে পারে।

বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে যে কোনো কোম্পানির মূলধন সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিএসইসির অনুমোদনের বিধান থাকলেও ২০১৯ সালের একটি বিশেষ ছাড়ের কারণে অতালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো কমিশনের অনুমোদন ছাড়াই মূলধন বাড়াতে পারে। নতুন বিধিমালায় এই ছাড় বাতিল করে মূলধন বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরজেএসসির পাশাপাশি বিএসইসির অনুমোদনও বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে মূলধন কাঠামো ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো এবং প্রকৃত অর্থ ছাড়াই প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যুর প্রবণতা কমবে বলে মনে করছে কমিশন।

এ বিষয়ে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, যেসব কোম্পানি পাবলিক ইন্টারেস্ট নিয়ে কাজ করে বা পাবলিকের সঙ্গে ডিল করে, তাদের মধ্যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করতে বিএসইসি নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই অনুযায়ী নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলমান আছে। শিগগিরই বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নিয়ে বিধিমালাটি চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হবে এবং জনমত যাচাইয়ের জন্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।