মেহেদী হাসান, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত লোকসানি কোম্পানি সোনারগাঁও টেক্সটাইলের শেয়ারদরে অস্বাভাবিক উল্লম্ফন দেখা গেছে। কোম্পানিটির ব্যবসায়িক অবস্থায় বড় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের তথ্য না থাকলেও দেড় মাসের কম সময়ে এর শেয়ারদর ৯২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে কারসাজির আশঙ্কা জোরালো হয়েছে। বিষয়টি নজরে আসার পর অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির কারণ জানতে কোম্পানিটির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ।

ডিএসই সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ এপ্রিল সোনারগাঁও টেক্সটাইলের শেয়ারদর ছিল ৩৩ টাকা ৯০ পয়সা। ৪ জুন তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫ টাকা ৩০ পয়সায়। অর্থাৎ এই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ৩১ টাকা ৪০ পয়সা বা ৯২ দশমিক ৬২ শতাংশ। স্বল্প সময়ে লোকসানি কোম্পানির শেয়ারদরে এমন বড় উল্লম্ফনকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে সোনারগাঁও টেক্সটাইল ডিএসইকে জানায়, কোম্পানির কাছে কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই। অর্থাৎ ব্যবসা সম্প্রসারণ, মুনাফা বৃদ্ধি, উৎপাদন উন্নয়ন, নতুন বিনিয়োগ, লভ্যাংশ ঘোষণা বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে এ দরবৃদ্ধি হয়নি। কোম্পানির এমন জবাবের পরও শেয়ারদরের দ্রুত বৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটির মৌলভিত্তি দুর্বল। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সোনারগাঁও টেক্সটাইল শেয়ারপ্রতি ১৯ পয়সা লোকসান করেছে। এর আগের অর্থবছরেও কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি ৮০ পয়সা লোকসান করে। ধারাবাহিক লোকসানের কারণে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। ফলে কোম্পানির আর্থিক অবস্থার সঙ্গে সাম্প্রতিক দরবৃদ্ধির স্পষ্ট মিল পাওয়া যাচ্ছে না।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো কোম্পানির শেয়ারদর বাড়া স্বাভাবিক ঘটনা। তবে সেই দরবৃদ্ধির পেছনে ব্যবসায়িক অগ্রগতি, মুনাফা বৃদ্ধি, উৎপাদন সম্প্রসারণ, নতুন চুক্তি, লভ্যাংশ বা মূল্য সংবেদনশীল তথ্য থাকা প্রয়োজন। কিন্তু কোনো লোকসানি কোম্পানির শেয়ারদর যদি অল্প সময়ে বড় অঙ্কে বাড়ে এবং কোম্পানি কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে না পারে, তাহলে সেটি বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকির সংকেত।

তাদের মতে, দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারদর হঠাৎ বাড়লে অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী দ্রুত মুনাফার আশায় সেখানে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু তারা অনেক সময় কোম্পানির আয়, লোকসান, লভ্যাংশ ইতিহাস, উৎপাদন অবস্থা বা আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করেন না। ফলে কৃত্রিমভাবে দর বাড়ানো হলে পরে দরপতনের সময় তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন।

পুঁজিবাজারে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও দেখা গেছে, যেসব কোম্পানির ব্যবসা দুর্বল বা লোকসানি, সেসব কোম্পানির শেয়ারদর অনেক সময় হঠাৎ বাড়তে থাকে। পরে বাজারে নানা ধরনের গুজব ছড়ানো হয়Ñকেউ বলে কোম্পানির ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াবে, কেউ বলে নতুন বিনিয়োগ আসছে, আবার কেউ বড় লভ্যাংশের সম্ভাবনার কথা বলে। কিন্তু এসব তথ্যের অনেক ক্ষেত্রেই কোনো ভিত্তি থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে গুজবনির্ভর বিনিয়োগ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।

সোনারগাঁও টেক্সটাইলের ক্ষেত্রেও কোম্পানির আর্থিক অবস্থা ও সাম্প্রতিক দরবৃদ্ধির মধ্যে বড় অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে। কোম্পানি লোকসানে রয়েছে, লভ্যাংশ দিতে পারেনি এবং কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্যও নেই। এরপরও শেয়ারদর ৩৩ টাকা ৯০ পয়সা থেকে ৬৫ টাকা ৩০ পয়সায় উঠে যাওয়া বাজারে অস্বাভাবিক লেনদেনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শুধু দর বাড়ছে বলে কোনো শেয়ারে বিনিয়োগ করা ঠিক নয়। বিনিয়োগের আগে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, আয়, লোকসান, সম্পদ, দায়, উৎপাদন পরিস্থিতি, লভ্যাংশের ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে যেসব কোম্পানির মৌলভিত্তি দুর্বল, সেগুলোর শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে আরও সতর্ক থাকা উচিত।

তারা আরও বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গুজব বড় ঝুঁকি। অনেক সময় একটি চক্র কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে শেয়ারদর বাড়ায়। পরে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা উচ্চ দামে শেয়ার কিনলে ওই চক্র শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে যায়। এতে দর কমে গেলে ক্ষতির মুখে পড়েন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তাই অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জের দ্রুত নজরদারি জরুরি।

বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেন, পুঁজিবাজারে কোনো কোম্পানির শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে কমিশন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে। কোম্পানির আর্থিক অবস্থা ও মূল্য সংবেদনশীল তথ্যের সঙ্গে দরবৃদ্ধির মিল না থাকলে সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, বাজারের স্বচ্ছতা ও কারসাজিমুক্ত লেনদেন নিশ্চিত করাই কমিশনের প্রধান অগ্রাধিকার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞানের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আল-আমিন বলেন, লোকসানি কোম্পানির শেয়ারের দর হঠাৎ বেড়ে যাওয়া পুঁজিবাজারের জন্য ভালো সংকেত নয়। কোম্পানির আয় ও লভ্যাংশের সঙ্গে দরবৃদ্ধির মিল না থাকলে সেখানে কারসাজির ঝুঁকি থাকে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অনেক সময় গুজবের ভিত্তিতে এসব শেয়ারে বিনিয়োগ করেন এবং পরে বড় ক্ষতির মুখে পড়েন। তাই ডিএসই ও বিএসইসির উচিত অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির পেছনের লেনদেন দ্রুত খতিয়ে দেখা।

বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পুঁজিবাজারে আস্থা ধরে রাখতে হলে দুর্বল কোম্পানির কৃত্রিম দরবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত কোম্পানির তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কোম্পানির শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে সেই লেনদেনের ধরন, বড় ক্রেতা-বিক্রেতার ভূমিকা এবং সম্ভাব্য কারসাজি দ্রুত তদন্ত করা দরকার।