ডিএসইর ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির তালিকা প্রকাশে মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন?
খালিদ হাসান: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৪২টি কোম্পানিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে একটি তালিকা প্রকাশ করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। বিনিয়োগকারীদের সচেতন ও ঝুঁকি থেকে সতর্ক করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে ডিএসই কর্তৃপক্ষ দাবি করলেও, তালিকাটি প্রকাশের পর থেকেই বাজারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে থাকা এবং নিয়মিত মুনাফা করা কিছু কোম্পানির নাম তালিকায় থাকায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বিনিয়োগকারী ও বাজারসংশ্লিষ্টরা।
ডিএসই জানিয়েছে, অডিটরদের পর্যবেক্ষণ, আর্থিক সূচক ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে কোন কোম্পানিকে ঠিক কী কারণে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারে এমন অনেক কোম্পানি রয়েছে, যেগুলো বছরের পর বছর লভ্যাংশ দেয় না, নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে না কিংবা ব্যবসায়িক কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এমনকি কিছু কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল আর্থিক অবস্থার মধ্যেও রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর মধ্যে অনেকে তালিকার বাইরে থাকলেও নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা ও মুনাফা করা কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকায় থাকায় এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
উদাহরণ হিসেবে বাজারসংশ্লিষ্টরা বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানি ডরিন পাওয়ার জেনারেশনস অ্যান্ড সিস্টেমস লিমিটেডের কথা উল্লেখ করছেন। ২০১৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে কোম্পানিটি ধারাবাহিকভাবে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আয়োজন ও লভ্যাংশ ঘোষণার করে যাচ্ছেন।
কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২২ সালে তাদের আয় ছিল ১ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকায়। ২০২৪ সালে আয় কমে ১ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকায় নেমে এলেও ২০২৫ সালে তা আবার বেড়ে ১ হাজার ৫০৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ওঠানামা থাকলেও কোম্পানিটি ধারাবাহিকভাবে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
মুনাফার ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। ২০২৩ সালে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ৩ টাকা ৫৬ পয়সা। ২০২৪ সালে তা কমে ১ টাকা ৮১ পয়সায় নামলেও ২০২৫ সালে আবার বেড়ে দাঁড়ায় ৩ টাকা ১৯ পয়সায়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ইপিএস দাঁড়িয়েছে ৪ টাকা ১৯ পয়সায়। কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) ৫২ টাকা এবং রিজার্ভের পরিমাণ প্রায় ৭৬০ কোটি টাকা।
এ ছাড়া গত ৮ জুন ডরিন পাওয়ার তাদের তিনটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠানকে মূল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে।
এ ধরনের পুনর্গঠন প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানিটির আর্থিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে। এমন প্রতিষ্ঠানের নাম ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় আসায় প্রশ্ন উঠেছে কীসের ভিত্তিতে তাদের ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলা হচ্ছে? কোম্পানি কর্তৃপক্ষ বা বিনিয়োগকারীরা যদি এর পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে না পারেন, তবে এই তালিকা বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পুঁজিবাজারে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ শব্দটির একটি বিশাল নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এমন তকমা সরাসরি শেয়ারের দরে বড় ধরনের ধস নামাতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পুঁজিবাজারের মূল চালিকাশক্তি হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা। তাই কোনো প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে সতর্কবার্তা জারি বা সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকা অপরিহার্য। অন্যথায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বাজারে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে।
তাদের মতে, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার জন্য ডিএসইর এ ধরনের উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। তবে কোন মানদণ্ডে কোন কোম্পানিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হলে বিনিয়োগকারীরা আরও সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। একই সঙ্গে তালিকাটি পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রয়োজন হলে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলেও মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিএসইর কাছে বিনিয়োগকারীদের দাবি—প্রকাশিত ৪২টি কোম্পানির ঝুঁকির কারণগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হোক, প্রয়োজনে তথ্য-উপাত্ত পুনরায় যাচাই-বাছাই করে বাজারে স্বচ্ছতা ও আস্থার পরিবেশ বজায় রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।যাতে তারা আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।



