চীনা বিনিয়োগের নতুন দ্বার খুলছে বাংলাদেশে, ১৭ চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা
দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগের নতুন দ্বার খুলছে। আগামী ২৩ জুন থেকে শুরু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তিন দিনের সম্ভাব্য চীন সফরের আগেই অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা জোরদারে একাধিক উদ্যোগ চূড়ান্ত করেছে সরকার। চীনা শিল্পাঞ্চল অনুমোদন, বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ থেকে শুরু করে বিডার বিদেশি কার্যালয়, এফটিএ আলোচনা, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য এবং করশুল্ক সুবিধা— সব মিলিয়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে চীনা বিনিয়োগের অন্যতম সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার কৌশলগত প্রচেষ্টা জোরদার হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে ১৭ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। গতকাল শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব এ তথ্য জানান। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বা চুক্তি সই হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এর মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুইটি চুক্তি, একটি অ্যাকশন প্ল্যান এবং একটি প্রটোকল সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। আগামী ২১ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হবে ২৪ জুন বেইজিংয়ে অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করছে। এতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ, অগ্রাধিকার খাত এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঘোষিত বিনিয়োগবান্ধব নীতিগুলো তুলে ধরা হবে।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, সফর উপলক্ষে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এর মধ্যে রয়েছে কেরানীগঞ্জ ইকোনমিক জোনে চীনা প্রতিষ্ঠান হান্ডা গ্রুপের জন্য জমি বরাদ্দ এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ডেভেলপার নিয়োগ সংক্রান্ত চুক্তি। পাশাপাশি তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প, মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন নিশ্চিত করার বিষয়টিও আলোচনায় থাকবে।
সফরের ঠিক আগে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি এসেছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল প্রকল্পে। মঙ্গলবার একনেক সভায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চীন সরকার প্রায় ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দেবে। প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠতে যাওয়া এই অর্থনৈতিক অঞ্চলকে সরকার বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ কেন্দ্র হিসেবে দেখছে।
কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় অঞ্চলটির ভৌগোলিক সুবিধাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি হিসাবে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অন্তত ১ লাখ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট হতে পারে।
চীনা বিনিয়োগকারীদের আরও কাছে যেতে বিডা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে চীনে তাদের প্রথম বিদেশি কার্যালয় চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই কার্যালয়ে স্থানীয় চীনা নাগরিকদের নিয়োগ দিয়ে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, তথ্য প্রদান এবং বিনিয়োগ-সংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করা হবে। ইতোমধ্যে বিডার অধীনে একটি বিশেষ ‘চায়না ডেস্ক’ চালু করা হয়েছে যা শুধুমাত্র চীনা বিনিয়োগকারীদের সেবা দেওয়ার জন্য কাজ করছে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর মতে, গত কয়েক বছরে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগ উৎসে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষায়িত সেবা কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।
সরকারের আরেকটি বড় লক্ষ্য হলো চীনা অর্থায়ন নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জানিয়েছে, চীন সরকার, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) মিলিয়ে ৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থায়ন প্রস্তাব বর্তমানে বিবেচনায় রয়েছে। এর মধ্যে চীন সরকারের অর্থায়নে অপেক্ষমাণ ৯টি প্রকল্পে ৪ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার, এআইআইবির অধীনে ১৭টি প্রকল্পে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার এবং এনডিবির আওতায় ৭টি প্রকল্পে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রস্তাব রয়েছে।
এই তালিকায় তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প, মোংলা বন্দরের উন্নয়ন, ডিজিটাল সংযোগ সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণ, কনটেইনার জাহাজ ক্রয়, গ্যাস নেটওয়ার্ক উন্নয়ন এবং রেল অবকাঠামো উন্নয়নসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প রয়েছে। পাশাপাশি ৯০০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পাওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে বাংলাদেশ-চীন ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট বা এফটিএ। বেইজিং ইতোমধ্যে যত দ্রুত সম্ভব আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। একইসঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি আধুনিকীকরণ, কারেন্সি সোয়াপ ব্যবস্থা চালু এবং বাংলাদেশি টাকা ও চীনা ইউয়ানে বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হবে।
চীনের প্রস্তাবিত ২৩ খাতভিত্তিক সহযোগিতা পরিকল্পনাও সফরের অন্যতম আকর্ষণ। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) কাঠামোর আওতায় প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, ব্লু ইকোনমি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল অর্থনীতিসহ বিস্তৃত ক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশেষ করে ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবন খাতে যৌথ সহযোগিতার বিষয়টি নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।
চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে নতুন বাজেটও বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ইলেকট্রিক যানবাহন, সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি, ইলেকট্রনিক্স, মোবাইল ফোন, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং শিল্প কাঁচামাল আমদানিতে ব্যাপক শুল্ক ও কর রেয়াতের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ইভি উৎপাদনে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প, সৌর প্যানেল ও ইনভার্টার, লিথিয়াম-আয়ন ও সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি, মোবাইল ফোন এবং ভোক্তা ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন খাত সরাসরি এসব সুবিধা পাবে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌর প্যানেল, ব্যাটারি, ইভি এবং ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে চীনের জন্য এসব খাত বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ সুযোগ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাসের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যদি নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারে তাহলে চীনা শিল্প ও প্রযুক্তি বিনিয়োগের বড় অংশ আকর্ষণ করার সুযোগ রয়েছে।
এরই মধ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে হান্ডা গ্রুপসহ কয়েকটি বড় চীনা প্রতিষ্ঠান। হান্ডা গ্রুপ প্রাথমিকভাবে ১৫০ মিলিয়ন ডলারসহ মোট ২৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে ২০২৫ সালে তিনটি চীনা কোম্পানি বাংলাদেশের টেক্সটাইল, পোশাক ও উৎপাদন খাতে ৩২২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করে বলছেন, শুধু বিদেশে অফিস খোলা বা নতুন চুক্তি করাই যথেষ্ট নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং করশুল্ক নীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের প্রবাহ আরও বাড়বে।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরের আগেই বাংলাদেশ সরকার চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বহুমাত্রিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিশেষ বিনিয়োগ সহায়তা কাঠামো, সম্ভাব্য এফটিএ, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, ৯ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন প্রস্তাব এবং বিনিয়োগবান্ধব বাজেট সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে বলা যায়, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের জন্য নতুন এক অধ্যায়ের দ্বার উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।



