৪ বছরে পদ্মা সেতুর টোল আয় ৩ হাজার ৪৭৫ কোটি ৭৩ লাখ
বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনা পদ্মা বহুমুখী সেতুর উদ্বোধনের চার বছর পূর্ণ হয়েছে। পদ্মা সেতুতে প্রতি বছর যান চলাচল বাড়ছে। এতে সেতু থেকে টোল আদায়ও বাড়ছে। তবে এ অর্থ খুব একটা জমা থাকছে না। বরং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের পর সেতু নির্মাণে গৃহীত ঋণ শোধেই টোলের বড় অংশ চলে যাচ্ছে। উদ্বোধনের পর পদ্মা সেতু থেকে আদায়কৃত টোলের ৭২ শতাংশই ঋণ পরিশোধে ব্যয় করেছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ)। সংস্থাটির সম্প্রতি হিসাবে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এতে দেখা যায়, উদ্বোধনের পর গত ৪ বছরে পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন পারাপার হয়েছে ২ কোটি ৬৭ লাখ ৭৫ হাজার ৫২৯টি। এতে মোট টোল আদায় হয়েছে ৩ হাজার ৪৭৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সেতুর রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয়েছে ৬০৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বা ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ অর্থ। আর সেতুটি নির্মাণে গৃহীত ঋণ থেকে সুদাসল পরিশোধ করা হয়েছে ২ হাজার ৫১৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা বা ৭২ দশমিক ৪১ শতাংশ অর্থ। সব ব্যয় বাদ দিয়ে উদ্বৃত্ত ছিল ৩৫৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা বা ১০ দশমিক ২০ শতাংশ অর্থ।
বিবিএর তথ্য মতে, পদ্মা সেতু নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার ৭৭০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ঋণ দেয় ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ১ শতাংশ সুদে ৩৪ বছরে মোট ১৪০ কিস্তিতে এ ঋণ শোধ করতে হবে। এতে গত ৪ বছরে বিবিএকে ঋণের বিপরীতে সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে ১ হাজার ১৭০ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এছাড়া ঋণের আসল পরিশোধ করতে হয়েছে ১ হাজার ৩৪৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
পদ্মা সেতু উদ্বোধন করা হয় ২০২২ সালের ২৫ জুন। পরের দিন (২৬ জুন) সেতুটি সর্বসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। যদিও নানা বিশৃঙ্খলার কারণে ২৭ জুন থেকে সেতুটিতে বাইক পারাপার বন্ধ করা হয়। এতে শুরুর দিকে সেতুটি যানবাহন পারাপারের সংখ্যা কিছুটা হ্রাস পায়। উদ্বোধনের পর ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ৫ দিনে পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন পারাপার হয় ১ লাখ ২১ হাজার ৮৯৫টি। এতে ১০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা টোল আদায় হয়। ওই ৫ দিনে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ছিল ১২ লাখ টাকা।
পরের অর্থবছর সেতুটি দিয়ে যানবাহন পারাপারের সংখ্যা ছিল ৫৭ লাখ ৪২ হাজার ৪৭৩টি। ২০২৩ সালের ২০ এপ্রিল আবারও সেতুটিতে বাইক পারাপারের অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর আবার গাড়ি চলাচলের সংখ্যা বাড়ে। ২০২২-২৩ অর্থবছর সেতুটি থেকে টোল আদায় হয় ৮২০ কোটি ৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয় ৮১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আর ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করা হয় যথাক্রমে ২৯৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা ও ৩৩৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। সব ব্যয় শেষে ওই অর্থবছর বিবিএর উদ্বৃত্ত ছিল ১০৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
বাইক চলাচলের অনুমতির পর পদ্মা সেতুতে যানবাহন পারাপারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। এতে ২০২৩-২৪ অর্থবছর সেতু দিয়ে যানবাহন পারাপার হয় ৬৭ লাখ ৫৪ হাজার ৮৩০টি। এতে পদ্মা সেতু থেকে টোল আদায় হয় ৮৫৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ব্যয় হয় ১৪৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। আর ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করা হয় যথাক্রমে ২৯৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা ও ৩ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। সব ব্যয় শেষে উদ্বৃত্ত ছিল ৭৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মাঝেও পদ্মা সেতুতে গাড়ি চলাচল বৃদ্ধি পায়। যদিও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে এ সংখ্যা অনেক হ্রাস পেয়েছিল। পরের মাসগুলোয় এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। এতে ওই অর্থবছর পদ্মা সেতুতে যান চলাচল বেড়ে দাঁড়ায় ৬৯ লাখ ৬৮ হাজার ৪৫টি। এতে সেতু থেকে টোল আদায়ও বেড়ে দাঁড়ায় ৮৭৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। রাজনৈতিক অস্থিরতায় আয় ব্যাপক হ্রাস পাওয়ায় ওই অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পদ্মা সেতুর ঋণ পরিশোধও বিঘ্নিত হয়।
তবে আয় বাড়ায় পরে তা পরিশোধ করে দেয় বিবিএ। ২০২৪-২৫ অর্থবছর পদ্মা সেতুর ঋণের সুদ পরিশোধ করা হয় ২৯১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ও আসল পরিশোধ করা হয় ৩৩৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। ব্যয় শেষে টোল থেকে উদ্বৃত্ত ছিল ৭১ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
এদিকে সদ্যবিদায়ী অর্থবছর (সাময়িক হিসাবে) পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন পারাপার বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৭১ লাখ ৮৮ হাজার ২৮৬টি। এতে টোল আদায় বেড়ে দাঁড়ায় ৯১২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ছিল ১৯৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। আর সুদ ও আসল পরিশোধ করা হয়েছে যথাক্রমে ২৮৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ও ৩৩৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এতে সব ব্যয় শেষে উদ্বৃত্ত ছিল ৯১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
বিবিএর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতি বছর পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন পারাপার বাড়ছে। এতে টোল আদায় স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। তবে যানবাহন পারাপারা বাড়ায় সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বাড়ছে। ফলে সুদ ও আসল পরিশোধ শেষে খুব একটা উদ্বৃত্ত থাকছে না। এছাড়া প্রতি ৫ বছর পর পর পদ্মা সেতুর বড় ধরনের মেইনটেইন্সের কাজ পরিচালনা করতে হবে। এতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হবে। ওই বছরগুলোতে সেতু কর্তৃপক্ষকে ঘাটতিতে পড়তে হবে।



