দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজারে চলমান আস্থার সংকট কাটিয়ে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই বাজার ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি বলেন, বাজারকে বিনিয়োগবান্ধব ও আকর্ষণীয় করে তুলতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এছাড়া  বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিজেরাই আগ্রহী হয়ে আসবেন। আলাদা করে রোড শো প্রয়োজন হবে না। আমরা যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছি বিনিয়োগকারীরা দ্রুত সুফল পাবেন।

আজ শনিবার বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (এফডিসি) আয়োজিত ‘পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট নিরসনে করণীয়’ শীর্ষক এক ছায়া সংসদ অনুষ্ঠানে কথা বলছিলেন তিনি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী। প্রতিযোগিতায় সরকারি দল হিসেবে প্রাইম ইউনিভার্সিটি এবং বিরোধী দল হিসেবে সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটির বিতার্কিকরা অংশগ্রহণ করেন।

মাসুদ খান জানিয়েছেন, বাজারের গভীরতা বাড়াতে ভালো মানের ও বৃহৎ কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে হবে। এ লক্ষ্যে আইপিওর পাশাপাশি ডিরেক্ট লিস্টিং পদ্ধতিকে আরও কার্যকর করা হবে। বিকাশ বা বড় ব্যাংকের মতো সুপ্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো দীর্ঘ ও জটিল আইপিও প্রক্রিয়া ছাড়াই সীমিত পরিমাণ শেয়ার ছেড়ে দ্রুত তালিকাভুক্ত হতে পারবে।

বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তির বিষয়ে তিনি বললেন, ব্যবসায়িক গোপনীয়তা, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং করপোরেট কৌশল প্রকাশের বাধ্যবাধকতা, স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক শর্তের কারণেও তারা পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী হয় না। তবে কমিশন এমন কিছু নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, যাতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত হয়।

আইপিও প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিএসইসি চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, বর্তমানে নির্ধারিত পাঁচ বছরের অডিটেড আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তথ্য ও বহু বছরের নথিপত্র চাওয়া হয়। ফলে আইপিও অনুমোদনে এক থেকে দেড় বছর সময় লেগে যায়।

প্রচলিত অডিটে নমুনাভিত্তিক যাচাই হওয়ায় অনেক অনিয়ম ধরা পড়ে না। তাই ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে কোম্পানির সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, বিক্রয়, ব্যয়, দায়-দেনা ও অন্যান্য আর্থিক তথ্যের পূর্ণাঙ্গ যাচাই করা হলে আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য ও সময়সাশ্রয়ী হবে।

ব্যাংক একীভূতকরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্ত সরকারের এবং এ বিষয়ে প্রধান নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে একীভূত হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশের খেলাপি ঋণ অত্যন্ত বেশি এবং ইকুইটি নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। ফলে প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। তাদের স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত হবে, সে বিষয়ে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে উপযুক্ত সমাধান দিতে হবে।

ব্রোকারেজ হাউজে অনিয়ম ও বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ রোধে হাতে স্বাক্ষরের পরিবর্তে ডিজিটাল অনুমোদন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথা জানান চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ডিএসইর নতুন ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারের মাধ্যমে অনুমোদন ছাড়া বিনিয়োগকারীর মোবাইল নম্বর বা ই-মেইল পরিবর্তন করা যাবে না। পাশাপাশি নিয়মিত ও ঝুঁকিভিত্তিক অডিট চালুর মাধ্যমে বিশেষ করে ছোট ব্রোকারেজ হাউজগুলোর কার্যক্রম কঠোরভাবে তদারকি করা হবে।

তার ভাষ্য, কমিশন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, সামষ্টিক স্বার্থে কাজ করবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারী শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। অধিকাংশ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী পর্যাপ্ত জ্ঞান ছাড়াই গুজব ও কারসাজিকারীদের অনুসরণ করে দুর্বল শেয়ারে বিনিয়োগ করেন। ফলে বারবার ক্ষতির শিকার হন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিনিয়োগকারী শিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে আরও শক্তিশালী করা হবে।

সভাপতির বক্তব্যে হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, দীর্ঘদিনের কারসাজি, সুশাসনের ঘাটতি ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে দেশের পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এ সংকট কাটাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কারের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান কমিশনের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে বাজারের গভীরতা বাড়াতে ভালো মানের দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করতে হবে।