মনির হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের বাজারে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে পোলাও চালের দাম। এক মাসের মধ্যে মানভেদে কেজিতে দাম বেড়েছে ৬০-৮০ টাকা। বর্তমানে খোলা পোলাও চাল ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং প্যাকেটজাত পোলাও চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ২৩০ টাকায়। দেশেই উৎপাদিত পোলাও চালের দাম এত বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত স্বল্পআয়ের মানুষেরা।

দাম বাড়ার কারণ হিসেবে সুগন্ধি চালের রপ্তানির অনুমোদনের পাশাপাশি করপোরেট ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকট তৈরিকে দায়ী করা হচ্ছে। হাতিরঝিল সংলগ্ন মধুবাগ চৌরাস্তার ভোলা রাইস এজেন্সিতে পোলাও চাল কিনতে গিয়েছিলেন নাসিম মিয়া। চিনিগুঁড়া পোলাও চালের দাম শুনে কিছুটা থমকে যান বেসরকারি এই চাকরিজীবী। পরে ইতস্তত করে না কিনেই চলে যান। পরে আক্ষেপের সঙ্গেই বলেন, এই দেশে মানুষ কী খেয়ে বাঁচবে।

বিক্রেতা তামিম হোসেন জানান, খোলা এক কেজি চিনিগুঁড়া পোলাও চালের দাম ১৮০ টাকা। তবে ভালোমানেরটি ২০০ টাকা। আর প্যাকেটেরগুলো রাখা যাবে ২৩০ টাকা। ব্র্যান্ডভেদে ১০-২০ টাকা কম হতে পারে। তবে কোনোটিই ২০০ টাকার নিচে নয়। এই দোকানি জানান, সর্বশেষ এক মাসের মাথায় কেজিতে পোলাও চালের দাম বেড়েছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। গত ছয় মাসে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ৮০ থেকে ১০০ টাকারও বেশি।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরেও দেখা গেছে, বর্তমানে ব্র্যান্ডভেদে প্যাকেটজাত পোলাও চাল (চিনিগুঁড়া/কালিজিরা) কেজিপ্রতি সর্বনিম্ন ২১০ থেকে সর্বোচ্চ ২৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর খোলা পোলাও চাল বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে। মুগদা বাজার থেকে ১৯০ টাকায় এক কেজি চিনিগুঁড়া পোলাও চাল কিনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আবদুস সাত্তার নামে এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, আগে শুনতাম ইলিশ মাছ, চিংড়ি মাছ রপ্তানি হওয়ার কারণে দেশে দাম বেশি থাকে। এখন দেখি পোলাও চালেরও দাম বেড়ে গেছে।

দেশ উৎপাদিত পোলাও চাল যদি এত দাম দিয়ে কিনতে হয়, সেটি আমাদের জন্য দুঃখজনক। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, এক মাস আগেও পাইকারি বাজারে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) সবচেয়ে বেশি বিক্রীত সুগন্ধি চাল চিনিগুঁড়ার (ভালোমানের) দাম ছিল ৭ হাজার ৫০০ টাকা। বর্তমানে দাম বেড়ে ১০ হাজারে ওঠে গেছে। অর্থাৎ এক মাসে বস্তাপ্রতি চিনিগুঁড়া চালের দাম বেড়েছে আড়াই হাজার টাকা।

মানিকনগর মোল্লা রাইস ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী মোকলেছ উদ্দিন মোল্লা জানান, পাইকারি বাজারে শোনা যাচ্ছে রপ্তানির কারণে পর্যাপ্ত চাল পাওয়া যাচ্ছে না। গত এক মাসে চিনিগুঁড়া সুগন্ধি চালের দাম বস্তাপ্রতি ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এখনো চাহিদা অনুযায়ী চাল পাওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতি ঠিক না হলে দাম আরো বাড়তে পারে। ঢাকার বাইরে নওগাঁর পৌর খুচরা ও পাইকারি চাল বাজার ঘুরে দেখা যায়, সপ্তাহের ব্যবধানে আতপ চিনিগুঁড়া চালের দাম কেজিতে ২০ থেকে ২৫ টাকা বেড়েছে। মাসের হিসাবে এই বৃদ্ধি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা।

বর্তমানে খোলা বাজারে মানভেদে চিনিগুঁড়া চাল বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়। আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্যাকেটজাত চালের দাম ২০০ থেকে ২১০ টাকা। একই সময়ে কাটারি ও জিরাশাইলসহ চিকন চালের দামও বেড়েছে। বর্তমানে এসব চাল বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৮২ টাকা কেজি। যদিও মোটা স্বর্ণা-৫ চালের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি।

নওগাঁ জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে চিনিগুঁড়া চালের দাম যে হারে বেড়েছে, তা স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাজারে কারা চালের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। দাম বাড়ার পেছনে রপ্তানি নাকি কৃত্রিম সংকট : কয়েক মাসের ব্যবধানে এই অস্বাভাবিক দাম বাড়ার পেছনে মোটাদাগে দুটি বিষয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। একটি হলো- সাম্প্রতিক সময়ে দুই দফায় বিপুল পরিমাণ সুগন্ধি চালের রপ্তানির অনুমোদন। আরেকটি বলা হচ্ছে কৃত্রিম সংকট।

রাজধানীর চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বিক্রেতারা এরই মধ্যে অনেক চড়া দামে সুগন্ধি চাল কিনছেন। ফলে তাদেরও পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে। এবছর অনেক বেশি সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দেওয়ায় এই দাম বাড়ছে বলে পাইকারি বাজারে গুঞ্জন রয়েছে। তবে রপ্তানিকারকরা বলছেন, মিল মালিক ও বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়েছে।

নওগা পৌরশহরের ফারিহা ও শেখ রাইস মিলের মালিক শেখ ফরিদ উদ্দিন বলেন, চালের ব্যবসা ধীরে ধীরে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। তারা যেভাবে দাম নির্ধারণ করছে, তার প্রভাব পুরো বাজারে পড়ছে। এতে ছোট ও মাঝারি মিল মালিকরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন না।

গত জুন ও চলতি জুলাই মাসে দুই দফায় ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে ৪৫ হাজার ৩২০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই রপ্তানির সময় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৫০০ টন রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছে সিটি অটো রাইস অ্যান্ড ডাল মিলস।

এ ছাড়া এলিন ফুড প্রোডাক্টসকে ৪০০ টন ও খান অ্যাগ্রো অ্যান্ড ফ্রোজেন ফুড প্রসেসরকে ৩০০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তালিকায় থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১০০ থেকে ২০০ টন পর্যন্ত চাল রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যদিও এই রপ্তানি অনুমোদনের কয়েক মাস আগে থেকেই সুগন্ধি চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। তবে, রপ্তানি অনুমোদনের পর দাম আরো দ্রুত বেড়ে চলছে।

তবে, বাংলাদেশ চাল রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ইশাকুল হোসেন জানান, গত এক মাসে মাত্র দুই হাজার টনের মতো চাল রপ্তানি হয়েছে। কৃষকরা যেন ন্যায্যমূল্য পান, তা নিশ্চিত করতেই সরকার রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু কিছু মিল মালিক চাল মজুদ করে রেখেছে এবং দাম বাড়িয়ে পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টায় রয়েছে।

তিনি আরো জানান, বাংলাদেশে কম করে হলেও বার্ষিক ১০ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদিত হয়। যেখানে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মাত্র চার লাখ টন। ফলে উদ্বৃত্ত থাকে প্রায় ছয় লাখ টন। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বৃত্ত চালের একাংশ রপ্তানি হলে দেশীয় বাজারের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ার কথা নয়। অবশ্য দেশের অন্যতম বৃহৎ খাদ্যপণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম স্বপন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করছেন। তার মতে, সুগন্ধি ধানের উৎপাদন কমে যাওয়া, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি এবং বিয়ে-সামাজিক অনুষ্ঠান বেড়ে যাওয়া এই সংকটের তৈরি করেছে। এজন্য বাজার স্থিতিশীল রাখতে সাময়িকভাবে পোলাও চাল রপ্তানি বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ দাবি করছেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বেশি থাকায় স্বাভাবিকভাবেই দেশীয় বাজারে দাম বাড়ছে। এবার প্রতি কেজি চাল রপ্তানির সর্বনিম্ন মূল্য ১.৬০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। সে হিসেবে বর্তমান ডলার রেট অনুযায়ী প্রতি কেজি সুগন্ধি চালের সর্বনিম্ন রপ্তানি মূল্য ১৯৭ টাকা। অথচ, এক মাস আগে যখন চাল রপ্তানির অনুমোদন মিলেছে তখন দেশে প্রতি কেজি চিনিগুঁড়া পোলাও চাল বিক্রি হতো ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে। সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানির চেয়ে স্থানীয় বাজারে দাম কম হওয়ায় এটি সমন্বয় হয়েছে।

তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, আমাদের দেশে বছরে ১০-১২ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদন হয়। বার্ষিক অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়েও যা থেকে কয়েক লাখ টন উদ্বৃত্ত থেকে যায়। ওই উদ্বৃত্ত অংশ থেকেই মাত্র কয়েক হাজার টন চাল বিভিন্ন দেশে রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এই যে রপ্তানি হবে এটিও বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা কিনবেন। সেই অর্থে দেশের মানুষের স্বার্থেই রপ্তানি হবে।

তিনি বলেন, রপ্তানির কারণে দাম বাড়ার যে গুঞ্জন উঠেছে, এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ব্যবসায়ীরা এটিকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে, সুযোগে দাম বাড়িয়ে নিচ্ছেন। তাছাড়া, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি ও জ্বালানি সংকটের যে অজুহাত দেওয়া হচ্ছে সেটিও অযৌক্তিক। যদি জ্বালানি ও পরিবহনের জন্য দাম বাড়তো, তাহলে অন্য চলেরও দাম বাড়ার কথা। এটি সম্পূর্ণ একটি ‘কৃত্রিম সংকট’, যা ব্যবসায়ীরা তাদের সুবিধার জন্য তৈরি করছেন।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ২০০৯-১০ অর্থবছরের দিকে বাংলাদেশ থেকে বিশ্ববাজারে সুগন্ধি চাল রপ্তানি শুরু হয়। প্রথমবার মাত্র ৬৬৩ টন রপ্তানি হলেও ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ পরিমাণ ১০ হাজার ৮৭৯ টনে উন্নীত হয়। পরে ২০২০-২১ অর্থবছরে সাড়ে ৮ হাজার টন এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫ হাজার ১০০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানি হয়েছিল।

এরপর ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন স্থগিত রেখেছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দফায় ২৩ হাজার ৯৫৯ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি মিলেছিল, যার মেয়াদ কয়েক দফায় বাড়িয়ে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত নির্ধারণ করেছিল সরকার। এবার দুই দফায় রপ্তানির লক্ষ্য প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৪৫ হাজার ৩২০ টনে উন্নীত করা হয়েছে।