বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক খাতের কোম্পানি উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ২০২১ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে একাধিক গুরুতর অনিয়ম, দুর্বল আর্থিক অবস্থা এবং নিয়ন্ত্রক বিধি লঙ্ঘনের তথ্য তুলে ধরেছেন নিরীক্ষক। এসব কারণে কোম্পানিটির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ‘কোয়ালিফায়েড মতামতের ভিত্তি’ প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক প্রতিবেদনের কয়েকটি বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের বিশেষভাবে সতর্ক করতে ‘এমফাসিস অব ম্যাটার’ অনুচ্ছেদও সংযোজন করা হয়েছে।

নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধান অনুযায়ী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। তবে ২০২১ সালের শেষে উত্তরা ফাইন্যান্সের যোগ্য মূলধন ঋণাত্মক ৩২৯ কোটি ৫৪ লাখ ৯৮ হাজার ৮৩৩ টাকা, যেখানে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে প্রয়োজনীয় মূলধন ছিল ৫৭৬ কোটি ২৩ লাখ ৬ হাজার ৮৭ টাকা।

ফলে কোম্পানিটির মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়ায় ৯০৫ কোটি ৭৮ লাখ ৪ হাজার ৯২১ টাকা। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিএআর) হওয়ার কথা ন্যূনতম ১০ শতাংশ হলেও তা নেমে এসেছে ঋণাত্মক ৫ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা নিয়ন্ত্রক নির্দেশনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, কোম্পানির নতুন সফটওয়্যারে তথ্য স্থানান্তরের সময় ঋণ, অগ্রিম ও লিজ হিসাবের ক্ষেত্রে ৪৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকার একটি পার্থক্য হিসাবভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া অগ্রিম, আমানত ও প্রিপেমেন্ট খাতে ৫৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকার লেনদেনের যথাযথ সমর্থনকারী নথি ও অনুমোদন পাওয়া যায়নি। ফলে এসব লেনদেনের যথার্থতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত নিরীক্ষা প্রমাণ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কোম্পানির হিসাবে অননুমোদিত লেনদেন-সংক্রান্ত প্রায় ১ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকার পাওনা দীর্ঘদিন ধরে সমন্বয়হীন অবস্থায় রয়েছে, যার অধিকাংশই সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী এসব সম্পদের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখার প্রয়োজন থাকলেও কোম্পানি তা না করে ২ হাজার ৯৭ কোটি ৯০ লাখ টাকার ব্লক দায় দেখিয়েছে। নিরীক্ষকের মতে, আন্তর্জাতিক হিসাবমান (আইএএস-৩৭) অনুসারেও এসব সম্পদের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করা উচিত ছিল।

আর্থিক অবস্থার অবনতির বিষয়টিও প্রতিবেদনে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২১ সালে কোম্পানিটির নিট সুদ ক্ষতি হয়েছে ২৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, পরিচালন ক্ষতি হয়েছে ১৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা এবং কর-পরবর্তী নিট ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ৩০৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা। ফলে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ২৩ টাকা ৫২ পয়সা। নিরীক্ষকের ভাষ্য, এসব সূচক কোম্পানির ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া আর্থিক অবস্থার ইঙ্গিত দেয়।

এছাড়া কোম্পানির সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইউএফআইএল ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডকে দেওয়া ২৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নীতিমালা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রুডেনশিয়াল গাইডলাইন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। পরে সহযোগী প্রতিষ্ঠানে মূলধন বিনিয়োগের মাধ্যমে ওই ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। তবে এ লেনদেনের প্রকৃত বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে পর্যাপ্ত নিরীক্ষা প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিরীক্ষকের ‘এমফাসিস অব ম্যাটার’ অংশে আরও বলা হয়েছে, কোম্পানির নতুন কোর ফিন্যান্সিয়াল সফটওয়্যার চালুর আগে এর কার্যকারিতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। ঋণ, আমানত, সুদ আয়, সুদ ব্যয়, সুদ স্থগিত হিসাব এবং প্রভিশন-সংক্রান্ত বিভিন্ন মডিউলে স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া ও সমন্বয় ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন বলে নিরীক্ষক মত দিয়েছেন।

এছাড়া কোম্পানির চলতি ও স্বল্পমেয়াদি আমানত হিসাবের ক্ষেত্রে ৪২৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকার লেনদেন আর্থিক বিবরণীতে প্রতিফলিত হলেও তা কোর ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেমের লেজারে রেকর্ড করা হয়নি। এর মধ্যে ৪১৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকারও বেশি লেনদেন সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও উল্লেখ করা হয়, কোম্পানিটি ১৩ কোটি ২৪ লাখ টাকার অবিতরণকৃত লভ্যাংশকে ‘অন্যান্য দায়’ হিসেবে দেখিয়েছে, যা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিএসইসির বিধান অনুযায়ী এ ধরনের অবিতরণকৃত লভ্যাংশ আলাদা শিরোনামে উপস্থাপন করে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সরকারের অনুকূলে হস্তান্তর করতে হয়। তবে নিরীক্ষক স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, উল্লিখিত বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও ‘এমফাসিস অব ম্যাটার’ এ বর্ণিত কারণগুলো তাদের নিরীক্ষা মতামত পরিবর্তন করেনি।