বিদ্যুৎ-জ্বালানি-গ্যাস সংকটের প্রভাব দেশের পুঁজিবাজারে, লেনদেনে ভাটা
আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজার যেন দীর্ঘদিন ধরে এক অদৃশ্য সংকটের মধ্যে আটকে আছে। রাজনৈতিক সরকার বদলেছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে এসেছে নতুন মুখ, নতুন বাজেটেও পুঁজিবাজারের গতি ফেরাতে বেশ কিছু ব্যবসাবান্ধব ও ইতিবাচক পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু তারপরও পুঁজিবাজারে কাঙ্খিত গতি ফিরছে না। সূচক স্থবির, লেনদেন কম, নতুন বিনিয়োগকারীর আগ্রহ নেই, আর পুরোনো বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ এখনো আস্থাহীন।
একসময় ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতের অনিয়ম, পুঁজিবাজার কারসাজি এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্যের কারণে বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। তাই সরকার পরিবর্তন হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে সংকট আরও গভীর হয়েছে। এখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে কেন পুঁজিবাজার চাঙ্গা হচ্ছে না?
এছাড়া বিএনপি সরকার গঠন করার আগে পুঁজিবাজারের শৃঙ্খলা ফেরানো ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন অর্থমন্ত্রী বাজার পুনরুজ্জীবনে একাধিক ইতিবাচক আশ্বাস দেন। এরই ধারাবাহিকতায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন করা হয় এবং নতুন বাজেটেও পুঁজিবাজারের গতি ফেরাতে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এত সব আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ ও সংস্কার সত্ত্বেও টানা পতনের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না পুঁজিবাজার। ক্রমাগত এই দরপতনে প্রতিদিন বাজার মূলধন কমছে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সঞ্চিত মূলধন হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছেন। নীতিগত সহায়তার পরও বাজারের এই লাগাতার মন্দাভাব বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে নামিয়ে এনেছে।
এছাড়া বেশ কিছুদিন ধরে তীব্র জ্বালানি সংকট বিরাজ করছে। একদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে কমছে শিল্পকারখানার উৎপাদন, অন্যদিকে বাড়ছে কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে শঙ্কা। এর সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকখাতের চাপ, বৈশ্বিক সংঘাত ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা সব মিলিয়ে অর্থনীতির চাপ যেন এসে পড়েছে পুঁজিবাজারে।
দীর্ঘ মন্দার পর ঘুরে দাঁড়িয়ে ৫ হাজার ৯০০ পয়েন্টের ঘর পেরোনো ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রধান সূচক মাত্র নয় কার্যদিবসে হারিয়েছে ২৭৪ পয়েন্ট। একই সঙ্গে হাজার কোটি টাকার ওপরে থাকা লেনদেন নেমে এসেছে ৫০০ কোটি টাকার ঘরে। দীর্ঘ মন্দার প্রভাবে চলতি বছরের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসই’র প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স নেমে আসে ৪ হাজার ৯১০ পয়েন্টে।
পরে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দেয়। ধারাবাহিক উত্থানে একপর্যায়ে সূচক ৫ হাজার ৯০০ পয়েন্টের ওপরে উঠে যায়। কিন্তু সেই উত্থানের ধারায় আবারও ছন্দপতন।
সম্প্রতি টানা দরপতনের পাশাপাশি কমেছে লেনদেনও। গত ১১ আগস্ট ডিএসইএক্স ছিল ৫ হাজার ৯০৩ পয়েন্ট। ২৫ আগস্ট লেনদেন শেষে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬৪০ পয়েন্টে। অর্থাৎ নয় কার্যদিবসে সূচক কমেছে ২৭৪ পয়েন্ট। এ সময়ে ৯ কার্যদিবসেই ডিএসইর সূচকের পতন হয়েছে। ৯ কার্যদিবস ধরে টানা দরপতনে নতুন করে ৩০ শতাংশের বেশি মূলধন হারিয়েছে বিনিয়োগকারীরা। ফলে পুঁজিবাজারে যেন কাটছেই না পতনের ধারা।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্পের চুল্লিতে জ্বালানি সংকটের যে আগুন জ্বলছে, তার উত্তাপ এখন সরাসরি পড়ছে পুঁজিবাজারে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ গ্যাস জ্বালানিতে যেন জ্বলছে পুঁজিবাজারও। জ্বালানি সংকট এখন আর শুধু শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয় নয়, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে তালিকাভুক্ত কোম্পানির আয়, মুনাফা ও শেয়ারের দামে।
ফলে অর্থনীতির দুর্বলতার প্রতিফলন হিসেবে পুঁজিবাজারেও চাপ বাড়ছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে নতুন আইপিও না আসা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর স্বল্পতা ও ভালো কোম্পানির সংকটও বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা বাড়িয়ে তুলছে।
জানা গেছে, সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের কিছুটা দরপতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। এদিন কমেছে টাকার পরিমানে লেনদেন ও বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ৩ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৬৪০ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ২ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ১ হাজার ১২৬ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ৪ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ২ হাজার ১২৬ পয়েন্টে।
দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯০ কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১৭৫ টির, দর কমেছে ১৫২ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৬৪ টির। ডিএসইতে ৫০৬ কোটি ৭১ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ২৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা কম। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৬০১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৯৩ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ১৬২ পয়েন্টে। সিএসইতে ১৮৮ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ৪৯ টির দর বেড়েছে, কমেছে ১১৯ টির এবং ২০ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ৪ কোটি টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।



