মেহেদী হাসান, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: জনস্বার্থ সম্পর্কিত কিছু কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে বাধ্যতামূলক তালিকাভুক্ত করতে ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানি’ নামে নতুন নীতিমালা করা হচ্ছে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এই নীতিমালা তৈরি করছে। ফলে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ছাড়াই পুঁজিবাজারে কোম্পানির সিকিউরিটিজ সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ দিতে নতুন বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি। এই নীতিমালার অধীন জনস্বার্থ সম্পর্কিত কিছু কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক করা হবে। এ লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ডাইরেক্ট লিস্টিং অব সিকিউরিটিজ বাই স্টক এক্সচেঞ্জ) রুলস, ২০২৬’ এর খসড়া অনুমোদন হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার বিএসইসির ১০২৭তম কমিশন সভায় চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এ খসড়া অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিশনের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিএসইসি জানিয়েছে, অনুমোদিত খসড়া বিধিমালাটি খুব শিগগিরই জনমত যাচাইয়ের জন্য পত্রিকায় এবং কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।

জনমত যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা ও সংশোধনের পর বিধিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে। প্রস্তাবিত বিধিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কোনো কোম্পানিকে আইপিওর মাধ্যমে নতুন শেয়ার ইস্যু করে বাজারে আসতে হবে না। বরং কোম্পানির বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানাধীন শেয়ারের একটি অংশ অফলোডের মাধ্যমে স্টক এক্সচেঞ্জে সরাসরি তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

এক্ষেত্রে কমপক্ষে ১০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ার অফলোডের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন শেয়ার তৈরি করে মূলধন সংগ্রহের পরিবর্তে কোম্পানির বিদ্যমান মালিকরা নিজেদের মালিকানাধীন শেয়ারের একটি অংশ বাজারে ছেড়ে দিলে সেই কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্ত হতে পারবে। এতে আইপিও প্রক্রিয়ার তুলনায় অপেক্ষাকৃত ভিন্ন একটি পথে পরিণত ও নির্দিষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারবাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে এই সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়নি। প্রস্তাবিত বিধিমালায় নির্দিষ্ট শ্রেণির কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য যোগ্যতার শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের সম্পূর্ণ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ পাবে। একইভাবে কোনো কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের কমপক্ষে ১০ শতাংশ সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মালিকানায় থাকলেও নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ থাকবে।

বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের সম্পূর্ণ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন কোম্পানিকেও এ তালিকায় রাখা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী নির্দিষ্ট যোগ্যতার বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানির জন্যও পুঁজিবাজারে প্রবেশের নতুন পথ তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া কমপক্ষে ৩০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন রয়েছে এমন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) অনুমোদিত টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারী, আইসিটি অবকাঠামো অথবা উৎপাদনকারী কোম্পানিও প্রস্তাবিত বিধিমালার আওতায় সরাসরি তালিকাভুক্ত হতে পারবে।

ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রেও বিশেষ যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। কমপক্ষে তিন বছর কার্যক্রম পরিচালনা করেছে এমন তফসিলি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানি নির্ধারিত অন্যান্য শর্ত পূরণ করলে ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের জন্য বিবেচিত হবে। অন্যদিকে, কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকা বার্ষিক টার্নওভার অথবা মোট সম্পদ রয়েছে এমন কোম্পানিকেও এই সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি কমিশনে নিবন্ধিত স্টক এক্সচেঞ্জ, ডিপোজিটরি ও সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি নির্ধারিত অন্যান্য শর্তও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে পূরণ করতে হবে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন এই কাঠামো কার্যকর হলে বড় ও প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির পুঁজিবাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে একটি বিকল্প পথ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যবসায়িক ভিত্তি শক্তিশালী, কিন্তু প্রচলিত আইপিও প্রক্রিয়ায় তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী নয়, তাদের জন্য ডাইরেক্ট লিস্টিং নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।