আর্থিক সংকট ও খেলাপি ঋণে মরতে বসেছে ফনিক্স ফাইন্যান্স
আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক খাতের কোম্পানি ফনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ধারাবাহিক লোকসান, ঋণাত্মক নিট সম্পদ ও বড় ধরনের তারল্য ঘাটতি এবং মূলধন পর্যাপ্ততায় ঘাটতির কারণে গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়েছে। ফলে কোম্পানিটি বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে। চলতি হিসাব বছরের দুই প্রান্তিকে ছয় মাস ও ৬ মাসের সমন্বিত হিসাবে যে লোকসানে পড়েছে কোম্পানিটি, তা পরিশোধিত মূলধনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। এ ছাড়া কোম্পানিটির যে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ রয়েছে, তা ফেরত দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এতে প্রায় মরতে বসেছে আর্থিক খাতের এই প্রতিষ্ঠানটি।
কোম্পানি কর্তৃপক্ষ বলছে, লোকসানের মূল কারণ হচ্ছে খেলাপি ঋণ। গত পাঁচ বছরে যে পরিমাণ ঋণ দেওয়া হয়েছে, তার অধিকাংশ ঋণই খেলাপি হয়ে গেছে। এতে কোম্পানিটির মুনাফা করা দূরের কথা, উল্টো টিকে থাকতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে দিন দিন কোম্পানির লোকসানের পরিমাণও বাড়ছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে যেসব কোম্পানির খেলাপি ঋণের চিত্র বের হচ্ছে, তার অধিকাংশই হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কাগুজে কোম্পানিকে দেওয়া ঋণ। অথবা টাকা নেওয়া দরকার ছিল বলে ভুয়া নথি দেখিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে বড় অর্থ বের করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এতে করে কোম্পানিগুলো বাজারে টিকে থাকা বা ব্যবসা টিকিয়ে রাখার ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এখানে সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও খারাপ অবস্থায় পড়বে।
তথ্য অনুযায়ী, ১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা পুঁজিবাজার থেকে তুলে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিটির বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩৮২ কোটি ৯৯ লাখ ৯ হাজার টাকা। যেখানে কোম্পানিটি দিন দিন বড় লোকসান গুনছে, সেখানে এই কোম্পানিকে দেওয়া ঋণ ফেরত পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কোম্পানিটির বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে অধিকাংশই খেলাপি হয়ে গেছে। ফলে অদূর ভবিষ্যতে কোম্পানিটির জন্য ব্যবসা টিকিয়ে রাখার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে।
২০২৫ সালের আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষা শেষে এসব বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির নিরীক্ষক। মাহমুদ সবুজ অ্যান্ড কোম্পানির ম্যানেজিং পার্টনার মাহমুদ হোসাইনের করা নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ফিনিক্স ফাইন্যান্সের আর্থিক দুরবস্থার বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির নিট লোকসান হয়েছে ৩৩৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে ফনিক্স ফাইন্যান্সের নিট লোকসান ছিল ৮০৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা। টানা লোকসানের প্রভাবে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষে প্রতিষ্ঠানটির নিট সম্পদ ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৯৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির মোট দায়ের পরিমাণ সম্পদের চেয়ে ১ হাজার ৬৯৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বেশি।
ফনিক্স ফাইন্যান্সের আর্থিক সংকটের অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তারল্য পরিস্থিতি। সম্পদ ও দায়ের মেয়াদভিত্তিক কাঠামো পর্যালোচনা করে নিরীক্ষক ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটির ওপর বড় ধরনের তারল্যচাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ফনিক্স ফাইন্যান্সের নিট তারল্য ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৬৮৮ কোটি ১২ লাখ ৪৭ হাজার ৩৪৬ টাকা। ফলে নির্ধারিত সময়ে বিভিন্ন দায় পরিশোধ এবং প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করা নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব পরিস্থিতি প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সক্ষমতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। যদিও আর্থিক বিবরণীটি ‘গোয়িং কনসার্ন’ বা চলমান প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে, তবে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম অনেকটাই নির্ভর করছে আয় বাড়ানোর জরুরি উদ্যোগ সফল হওয়া এবং নতুন করে অতিরিক্ত মূলধন সংগ্রহের ওপর। ফিনিক্স ফাইন্যান্সের মূলধন পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১০ সালের ২ আগস্টের সার্কুলার এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মূলধন পর্যাপ্ততা ও বাজার শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ন্যূনতম মোট মূলধন ও মূলধন সংরক্ষণ বাফার মিলিয়ে ১০ শতাংশ থাকার কথা। কিন্তু ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষে ফিনিক্স ফাইন্যান্সের মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেমে এসেছে ঋণাত্মক ১০৯ দশমিক ৬৮ শতাংশে। অর্থাৎ নির্ধারিত ন্যূনতম ১০ শতাংশের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির মূলধন পর্যাপ্ততায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সংকটের পাশাপাশি হিসাবরক্ষণ প্রক্রিয়াতেও কিছু অসংগতি চিহ্নিত করেছেন নিরীক্ষক।
ঢাকার দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় ফনিক্স ইন্স্যুরেন্সের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় একটি আটতলা ভবন রয়েছে ফনিক্স ফাইন্যান্সের। ভবনটির প্রথম তলার প্রায় ৪ হাজার ৩৫১ বর্গফুট জায়গা প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব শাখা, শেয়ার বিভাগ ও গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছে। ভবনের বাকি অংশ ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালে ভবনটির ভাড়া থেকে প্রায় ১ কোটি টাকা আয় করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে ভাড়া দেওয়া অংশকে ‘বিনিয়োগ সম্পত্তি’ হিসেবে আলাদাভাবে শ্রেণিবদ্ধ না করে পুরো ভবনটিকেই স্থায়ী সম্পদ হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া আয়কর রিটার্নে কম কর দেখিয়ে সেই অর্থ পরিশোধ করা হলেও অতিরিক্ত ২ কোটি ৪৬ লাখ টাকার কর প্রভিশন সমন্বয় করা হয়নি বলে নিরীক্ষক জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে ধারাবাহিক লোকসান, ঋণাত্মক নিট সম্পদ, প্রায় ১ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকার তারল্য ঘাটতি, মূলধন পর্যাপ্ততায় বড় ঘাটতি এবং হিসাবরক্ষণে পাওয়া অসংগতিগুলো ফনিক্স ফাইন্যান্সের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।
৩০০ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনের বিপরীতে কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ১৬৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। কোম্পানিটির রিজার্ভে ঘাটতি রয়েছে ১৮ কোটি ৭৪ লাখ ১৭ হাজার টাকা। কোম্পানির ১৬ কোটি ৫৮ লাখ ৭৪ হাজার ১৯৫টি শেয়ার রয়েছে। এর মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের কাছে ২৬ দশমিক ০১ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ১৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকাদের কাছে রয়েছে ৫৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ শেয়ার।



