বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত চার মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিটের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালে লভ্যাংশ দেওয়ার পর আর কোনো লভ্যাংশ দেয়নি আলোচনায় থাকা চার ফান্ড। অথচ গত ছয় মাসে এসব ফান্ডের ইউনিটের দর বেড়েছে ৮৪ থেকে ২৩৭ শতাংশ পর্যন্ত। এসব ফান্ডের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে কোনো তথ্যও প্রকাশিত হয়নি। অন্যদিকে, দর বাড়ার সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পেইড গ্রুপে নির্দিষ্ট ফান্ড নির্দিষ্ট সময়ে ও দামে কেনার প্রচার করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) তদন্তে কিছু হিসাবে সন্দেহজনক লেনদেন ও নিজেদের মধ্যে ইউনিট কেনাবেচা এবং পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলেও ইউনিট কেনার সুযোগ দেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

মুলত চার মিউচুয়াল ফান্ডের কারসাজির নেপথ্যে রয়েছেন কে এই আশরাফুল। মুলত লোকসানে থাকা বিনিয়োগ পোর্টফোলিও, কমতে থাকা নিট সম্পদমূল্য ও নিম্নমুখী পুঁজিবাজার কোনোটিই থামাতে পারেনি এক্সিম ব্যাংক ফার্স্টসহ চারটি মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট দরের উত্থান। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে এই লোকসানি ফান্ডগুলোর দর বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি, আর এর পেছনে বারবার উঠে এসেছে একটি নাম মো: আশরাফুল ইসলাম।

আশরাফুলের পরিচয় নিয়ে কৌতূহল বাড়ে আরেকটি তথ্যে। সূত্র মতে, রাজধানীর উত্তরায় এরিনা সিকিউরিটিজ সহ দুটি ব্রোকারেজ হাউসের শাখা তাঁর নিয়ন্ত্রণে। হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামে তাঁর পেইড গ্রাহকসংখ্যা ২ হাজার ৭০০ ছাড়িয়েছে। তার নিয়ন্ত্রনে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ফান্ড রয়েছে বলেও সুত্রটি দাবি করেছে।

ডিএসই তদন্ত সূত্র জানা গেছে, গত ৫ জুলাই থেকে ২ আগস্ট এই সময়ে এক্সিম ফার্স্টের শীর্ষ ক্রেতা-বিক্রেতার বড় অংশই ছিল এরিনা সিকিউরিটিজের গ্রাহক, যে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণের দাবিদার আশরাফুল নিজেই। শীর্ষ সাত ক্রেতার সবাই ছিলেন তাঁর প্রভাব বলয়ে, আর আশরাফুল নিজে ছিলেন ফান্ডটির ষষ্ঠ বৃহত্তম ক্রেতা ও সপ্তম বৃহত্তম বিক্রেতা। সংখ্যায় এই চিত্র স্পষ্ট। এরিনা সিকিউরিটিজে এসআর ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি হিসাবে ৬৮ লাখ ৩৬ হাজার ৮০ ইউনিট কেনা ও ১৯ লাখ ৯৪ হাজার ১৬৮ ইউনিট বিক্রি।

একই শাখায় আফরোজা আক্তার আজমিনের হিসাবে ২৮ লাখ ৯২ হাজার ৬০০ ইউনিট কেনা ও সমপরিমাণ বিক্রি। রহমান ইকুইটি ম্যানেজমেন্টে থাকা আরেকটি এসআর ইন্টারন্যাশনাল হিসাবে ১৯ লাখ ৯০ হাজার ৬৫৯ ইউনিটের অভিন্ন কেনাবেচা। আরও চমকপ্রদ তথ্য এই দুই গ্রাহকের নগদ হিসাবে টাকাই ছিল না, তবু প্রায় ১৭ লাখ টাকার ইউনিট কেনার সুযোগ পেয়েছেন তাঁরা এরিনা সিকিউরিটিজ থেকে। প্রয়োজনীয় মার্জিন চুক্তি ছাড়াই এই সুবিধা দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিএসইসির মার্জিন বিধিমালা, ২০২৫-এর বিধি ৬ লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে তদন্ত দল।

ডিএসইর তদন্তে আরও দেখা যায়, পর্যাপ্ত নগদ অর্থ না থাকা সত্ত্বেও দুটি গ্রাহকের হিসাবে প্রায় ১৭ লাখ টাকার ইউনিট কেনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় মার্জিন চুক্তি না থাকায় এটিকে ২০২৫ সালের বিএসইসি মার্জিন বিধিমালার ৬ নম্বর বিধির লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৩ জুলাই অ্যাবাসি ইনভেস্টমেন্টসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি বিও হিসাব একই গ্রিন ডেল্টা সিকিউরিটিজ টার্মিনাল ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে তিন দফা লেনদেন করে।

এতে ১ লাখ ১৯ হাজার ইউনিট লেনদেন হয়। ডিএসইর তদন্তে এটিকে বাজারে কৃত্রিম লেনদেনের উপস্থিতি তৈরির ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দরবৃদ্ধির সময়ে এক্সিম ফার্স্টের মালিকানাতেও বড় পরিবর্তন হয়েছে। জুন শেষে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা ইউনিটের অংশ ছিল ২৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। জুলাই শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ দশমিক ২৬ শতাংশে।

তবে আগস্ট শেষে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা ইউনিটের সংখ্যা কমে ২ কোটি ৭৭ লাখ ৫ হাজার ৭৭৬টিতে নেমে আসে। জুলাইয়ের তুলনায় এক মাসে তা কমেছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৬৯ হাজার ২২৪ ইউনিট। অন্যদিকে, আগস্ট শেষে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা ইউনিটের অংশ বেড়ে ৫৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ হয়েছে। ফলে লভ্যাংশ না দেওয়া, ইউনিটের দর অস্বাভাবিক হারে বাড়া এবং দরবৃদ্ধির সময়ে সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য সব মিলিয়ে আলোচনায় থাকা মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর সাম্প্রতিক দরবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

জুনে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এক্সিম ফার্স্টের ইউনিট গড়ে ৩ টাকা ৪০ থেকে ৩ টাকা ৫০ পয়সা দরে কিনেছিলেন। পরে এর একটি অংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৬ টাকা ১০ থেকে ৬ টাকা ৯০ পয়সা দরে বিক্রি হয়েছে। আলোচনায় থাকা ফান্ডগুলো হলো: এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, পিএফ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এমবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড এবং ফার্স্ট প্রাইম ফাইন্যান্স মিউচুয়াল ফান্ড।

এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট ও পিএফ ফার্স্ট সর্বশেষ ২০২৩ সালে ৩ শতাংশ করে লভ্যাংশ দিয়েছে। এমবিএল ফার্স্ট দিয়েছে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ফার্স্ট প্রাইম ফাইন্যান্স দিয়েছে ১০ শতাংশ। এরপর আর কোনো লভ্যাংশ দেয়নি এসব ফান্ড। গত ছয় মাসের বাজারদর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৫ মার্চ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এমবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দর ৪ টাকা ২০ পয়সা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ৬০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।

অর্থাৎ, এ সময়ে দর বেড়েছে ৬ টাকা ৪০ পয়সা বা ১৫২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। একই সময়ে প্রাইম ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দর ১৯ টাকা ২০ পয়সা থেকে বেড়ে ৩৫ টাকা ৪০ পয়সা হয়েছে। এতে দর বেড়েছে ১৬ টাকা ২০ পয়সা বা ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

পিএফ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দর ৫ টাকা ৪০ পয়সা থেকে বেড়ে ১৮ টাকা ২০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, ছয় মাসে দর বেড়েছে ১২ টাকা ৮০ পয়সা বা ২৩৭ দশমিক ০৪ শতাংশ। আর এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দর ৩ টাকা ৪০ পয়সা থেকে বেড়ে ৬ টাকা ৯০ পয়সা হয়েছে। এতে দর বেড়েছে ৩ টাকা ৫০ পয়সা বা ১০২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। অর্থাৎ, লভ্যাংশ না দেওয়া সত্ত্বেও ছয় মাসে চার ফান্ডের ইউনিটের দর ৮৪ থেকে ২৩৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (রিসার্চ অ্যানালিস্ট) বিধিমালা, ২০১৩ অনুযায়ী যথাযথ নিবন্ধন ছাড়া বিনিয়োগ-সংক্রান্ত পরামর্শ প্রকাশের সুযোগ নেই। বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিত পরামর্শদাতাদের এমন প্রচারণায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা প্রভাবিত হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে তাদের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিও তৈরি হয়। বিভিন্ন গ্রুপে আশরাফুল দাবি করেছেন, তার গ্রুপের ২ হাজার ৭০০-এর বেশি গ্রাহকের প্রায় ৩০০ কোটি টাকার তহবিল তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে তার বক্তব্য জানার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

দীর্ঘদিন লভ্যাংশ না দেওয়া ও সম্পদের মূল্য কমার পরও কোনো ফান্ডের ইউনিটের দর দ্রুত বাড়া স্বাভাবিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন একটি ব্রোকারেজ হাউসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেনার প্রচার ও সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য থাকলে বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থার গভীরভাবে খতিয়ে দেখা উচিত।