বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর প্রশ্নটি হলো-আসছে ডিসেম্বরে কী ঘটতে চলেছে? সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ভারতের নয়াদিল্লি থেকে আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হওয়ার পরিকল্পনা করছেন এমন আন্তর্জাতিক ও গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশের পর থেকেই দেশজুড়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠ মহল আকাশ ও স্থলপথের একাধিক বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে ছক কষছে বলে জানা গেছে। একই সাথে দেশের ভেতরের সাম্প্রতিক অস্থিতিশীলতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরকার শুদ্ধি অভিযান এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।

এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান না নিয়ে বিষয়টি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার এবং বিএনপির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ‘খুব ভালো’ বলে মন্তব্য করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।

ওয়াশিংটনের এই অবস্থানকে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে শেখ হাসিনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো পক্ষকে সমর্থন করছে এমন সরাসরি বক্তব্য ব্রিফিংয়ে দেওয়া হয়নি।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার ঢাকার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নিউইয়র্কে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক ‘অন-ব্যাকগ্রাউন্ড’ ব্রিফিংয়ের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। এর আগের দিন, ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক ফরেন প্রেস সেন্টারে ‘একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও সার্বভৌম দক্ষিণ এশিয়ার সমর্থনে মার্কিন নীতি’ শিরোনামে ব্রিফিংটি অনুষ্ঠিত হয়।

এতে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সাংবাদিকেরা অংশ নেন। ব্রিফিংয়ের আগে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিথানি মরিসন দক্ষিণ এশিয়ার পরিস্থিতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি নিয়ে বক্তব্য দেন।

ব্রিফিংয়ে শেখ হাসিনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান জানতে চাওয়া হলে মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে ওয়াশিংটন এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের বিষয়টি

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ বা উত্তেজনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে দুই দেশ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একটি সমাধানে পৌঁছাবে বলে যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে। শেখ হাসিনার সঙ্গে কী করা উচিত, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান জানায়নি বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।প্রবাসী নেটওয়ার্কে যোগদিন

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বক্তব্যের তাৎপর্য রয়েছে মূলত দুটি কারণে। প্রথমত, শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো, তাকে বিচারের মুখোমুখি করা কিংবা ভারতে তার অবস্থান অব্যাহত রাখা এসব বিষয়ে ওয়াশিংটন কোনো নির্দিষ্ট সমাধান সামনে আনেনি। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টিকে সরাসরি নিজেদের দ্বিপক্ষীয় বা একতরফা সিদ্ধান্তের বিষয় হিসেবে না দেখে ঢাকা ও দিল্লির আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, সেটিকে দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সামলানোর পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র অবস্থান নিয়েছে বলে ব্রিফিং থেকে বোঝা যায়।

শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়ার পর ভারত চলে যান এবং এরপর থেকে সেখানেই অবস্থান করছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন।

এদিকে বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল ও জুলাইয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে পাওয়া প্রত্যর্পণের অনুরোধ আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।