আর্থিক খাত ঢেলে সাজাতে ১২৬১ কোটি টাকা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক
বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত ঢেলে সাজাতে ১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্টের (এফএসএসপি-২) আওতায় এ ঋণ দেবে সংস্থাটি। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সুরক্ষা জোরদার, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং শক্তিশালী ও ব্যাংকিং খাত সংস্কার কার্যক্রমের সহায়ক হবে। এছাড়া আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন, পারফরম্যান্সভিত্তিক শর্তাদির মাধ্যমে আর্থিকখাতের সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, ডিআইটিএফের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ ব্যাংক রেজল্যুশন ও ব্যাংক পুনর্গঠনের মাধ্যমে আর্থিক স্থিতিশীলতার উন্নতি প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য।
প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এসব প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান। চলতি অর্থবছরের চতুর্থ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ১৫ হাজার ৮২৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ের ১৩টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প রয়েছে ৮টি। পাশাপাশি ৩টি প্রকল্প সংশোধন এবং ২টি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা বিভাগ জানায়, প্রকল্পের মোট ব্যয় এক হাজার ২৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন মাত্র ১৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, বাকি অর্থ ঋণ দেবে বিশ্বব্যাংক। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত।
ব্যাংকিং ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের আর্থিক খাত দ্রুত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ মাত্রার নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল), সুশাসনের অভাব ও পুরোনো আইসিটি ব্যবস্থার কারণে দেশের ব্যাংকিং এবং আর্থিক খাত অব্যাহতভাবে বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।
কিছু ব্যাংক, বিশেষ করে সরকারি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক তারল্য ও মূলধন সংকটের সম্মুখীন হওয়ায় ঋণাত্মক মূলধনের সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক টানাপোড়েন সমস্যাগুলো আরও বাড়িয়েছে, যা জিডিপির গতি মন্থর করেছে এবং পদ্ধতিগত ঝুঁকি তৈরি করেছে। এছাড়া ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের তদারকি ব্যবস্থায় পুরোনো আইসিটি অবকাঠামো, সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে সাইবার আক্রমণ এবং ক্রস-বর্ডার আর্থিক ঝুঁকির মতো উদীয়মান ঝুঁকি মোকাবিলায় বাধা সৃষ্টি করছে।
সম্মিলিতভাবে এ চ্যালেঞ্জগুলো আমানতকারীর আস্থা, আর্থিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এসব সমস্যা মোকাবিলা করতে এবং আর্থিকখাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতেই এ প্রকল্প। তবে প্রকল্পের কিছু খাতের ব্যয় নিয়ে আপত্তি আছে পরিকল্পনা কমিশনের। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের বড় অংশই প্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়নে যাচ্ছে। শুধু আইসিটি সরঞ্জাম কেনায় বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭১১ কোটি ৭১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
কম্পিউটার সফটওয়্যারের জন্য ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ পাঁচ হাজার ও ডেটাবেজ তৈরিতে সাত কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা রাখা হয়েছে। কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক সামগ্রীতে আরও এক কোটি পাঁচ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা আছে। মূলধন খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭৭ কোটি ২৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। প্রশিক্ষণেও উল্লেখযোগ্য অর্থ রাখা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় তিন হাজার ৫৬৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। এজন্য বরাদ্দ ৭০ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে আইডিএর অর্থায়ন ৬৭ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অংশ তিন কোটি টাকা। এছাড়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শক নিয়োগে মোট ৯৪ কোটি ৪৩ লাখ ৬২ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
ব্যক্তিগত পরামর্শকের জন্য ২৯ কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজার এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সেবায় ৬৫ কোটি ৩৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা ব্যয়ের সংস্থান রাখা হয়েছে। প্রকল্পের রাজস্ব খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮৮ কোটি ২৯ লাখ ২৯ হাজার টাকা। সেমিনার ও সম্মেলনে প্রায় ২০ কোটি টাকা এবং যানবাহন ব্যবহারে দেড় কোটি টাকা রাখা হয়েছে। তবে নতুন গাড়ি কেনার সুযোগ নেই। প্রয়োজনে চুক্তিভিত্তিক পরিবহন নেওয়া যাবে, সেক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। আগের প্রকল্পের ব্যবহারযোগ্য কিছু যন্ত্রপাতি নতুন কর্মসূচিতে স্থানান্তরের বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে। তবে অচল বা ব্যবহারের অনুপযোগী সামগ্রী নেওয়া যাবে না।
আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তদারকি ক্ষমতা এবং আইসিটি কাঠামো শক্তিশালীকরণ, আইসিটি অবকাঠামো শক্তিশালীকরণে ক্রয় সক্ষমতা উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া, পারফরম্যান্সভিত্তিক শর্তাদির (পিবিসি) মাধ্যমে আর্থিক খাতের সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কার্যক্রমে সহায়তা দেওয়া।
এছাড়া ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, পেমেন্ট সময়কাল কমানোসহ ব্যাংক রেজল্যুশন ও ব্যাংক পুনর্গঠনের কার্যকর বাস্তবায়ন করা হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকের শাসনব্যবস্থা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার উন্নতি করা হবে।



