আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম প্রধান আর্থিক খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু দেশের অর্থনীতির আকার যতটা বেড়েছে, পুঁজিবাজারের গভীরতা, প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ ও বিদেশি বিনিয়োগপ্রবাহ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়েনি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কাঠামো এখনো ব্যাংকনির্ভর, যার কারণে আর্থিক ব্যবস্থায় এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।

গত ২৮ মাসে দেশের পুঁজিবাজারে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। তবে প্রতিবেশী দেশগুলো যখন প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) মাধ্যমে নতুন নতুন কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে এনে বিপুল মূলধন সংগ্রহ করছে, তখন বাংলাদেশে টানা ২৮ মাস ধরে মূলধারার পুঁজিবাজার ও এসএমই উভয় বাজারেই একটি নতুন আইপিওরও অনুমোদন হয়নি। দেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যা বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে একটি উদ্বেগজনক ও লজ্জাজনক রেকর্ড।

ডিএসই সূত্রে জানা যায়, গত পাঁচ বছরে আইপিওর মাধ্যমে ৫২টি কোম্পানি মোট ৭ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা পুঁজিবাজার থেকে সংগৃহীত হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে চারটি কোম্পানি ৩২৭ কোটি, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৫টি কোম্পানি ১ হাজার ২৮৬ কোটি, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৫টি কোম্পানি ৪ হাজার ৮৪৮ কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে নয়টি কোম্পানি ৬৭৮ কোটি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নয়টি কোম্পানি ৮৪১ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আইপিওর মাধ্যমে কোনো অর্থ সংগ্রহ হয়নি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও এখনো কোনো আইপিও আসেনি। মূলত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিক থেকেই বাজারে নতুন আইপিও আসা বন্ধ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, ব্যাংক ঋণ সহজলভ্য হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি অর্থের জন্য ব্যাংকে ছুটছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। ফলে শিল্পায়নে খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারছে না দেশের পুঁজিবাজার। দিন যত যাচ্ছে, শিল্পায়নে পুঁজিবাজারের অবদান তত কমছে। দেশের শিল্পায়নে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের অতিনির্ভরতা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে, যেখানে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের চিত্রটি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

শিল্প খাতে মোট অর্থায়নের সামান্য অংশ মাত্র পুঁজিবাজার থেকে আসায় দেশের পুরো অর্থনৈতিক ঝুঁকি গিয়ে পড়ছে ব্যাংক খাতের ওপর। ভালো শেয়ারের দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি এবং নীতিনির্ধারণী দুর্বলতার কারণেই মূলত এমন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিশেষজ্ঞরা নীতিমালায় কাঠামোগত পরিবর্তন এনে বড় প্রকল্পে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের অর্থায়নে একটি যৌক্তিক অনুপাত নির্ধারণ এবং পুঁজিবাজার থেকে পুঁজি উত্তোলন বাধ্যতামূলক করার জোর তাগিদ দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির তথ্য সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের শিল্পায়নে ব্যাংক খাত থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অর্থায়ন হয়েছে ৯৭ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। বিপরীতে পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ৩০২ কোট টাকা। আলোচ্য অর্থবছরে শিল্পায়নে অর্থায়নে পুঁজিবাজার থেকে এসেছে মাত্র ০.৩১ শতাংশ। আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যাংকিং মাধ্যমে অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ৮৮ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা।

আর পুঁজিবাজার থেকে এসেছে ৬৭৯ কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসাবে ০.৭৬ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংকিং মাধ্যমে অর্থায়ন হয়েছে ৯৫ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। আর পুঁজিবাজারের মাধ্যমে এসেছে ৬৪১ কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসাবে মাত্র ০.৬৭ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে এসেছে ৭২ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। আর পুঁজিবাজারের মাধ্যমে পুঁজির সংস্থান হয়েছে ৬৮৫ কোটি টাকা, যা মোট অর্থায়নের ০.৯৪ শতাংশ।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের মন্দা ভাব এবং শেয়ারের প্রত্যাশিত মূল্য না পাওয়ার আশঙ্কায় উদ্যোক্তারা আইপিওতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। পাশাপাশি অতীতে আইপিওকে ঘিরে অনিয়ম, কারসাজি ও বিতর্কের ঘটনাও অনেক ভালো কোম্পানিকে বাজারে আসতে নিরুৎসাহিত করেছে। গত দেড় দশকে আইপিওর মাধ্যমে ১৪৯টি কোম্পানি প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করলেও এদের অনেকগুলো এখন আর্থিকভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।

পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ২০২৪ সালে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে। এই টাস্কফোর্সের সুপারিশের ভিত্তিতে বেশ কিছু আইনী সংস্কার করা হয়েছে। এর মধ্যে নতুন আইপিও বিধিমালাও রয়েছে। অবশ্য অআইনী সংস্কার স্বত্তেও এখন পর্যন্ত ছোট কিংবা বড় কোনো কোম্পানিই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করে নি।

তাছাড়া অন্তবর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক কোম্পানি এবং বহুজাতিক কোম্পানিতে থাকা সরকারের শেয়ার পুঁজিবাজারে ছাড়ার উদ্যোগ এখনো আলোর মুখ দেখে নি।

এদিকে পুঁজিবাজারে আইপিও না এলেও ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে শিল্প খাতে অর্থায়ন বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেড় বছরে শিল্প খাতে ব্যাংক ঋণ বেড়ে ৬ লাখ ৪২ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা থেকে ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ফলে উদ্যোক্তারা সহজলভ্য ব্যাংক ঋণের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) সভাপতি এবং ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বলেন, গত ২৮ মাসে পুঁজিবাজারে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে পারেনি। দীর্ঘসূত্রতার কারণেই মূলত উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী হন না।

আমাদের দেশে একটি আইপিও অনুমোদন হয়ে বাজারে আসতে সর্বনিম্ন ১৫ মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। অথচ ব্যাংকে আবেদন করলে মাত্র তিন সপ্তাহেই ঋণ পাওয়া সম্ভব, ক্ষেত্রবিশেষে সর্বোচ্চ তিন মাস সময় লাগে। ফলে উদ্যোক্তারা স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

তবে নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার উদ্যোগ নিয়ে আশা প্রকাশ করে বিএপিএলসি সভাপতি আরো বলেন, পুঁজিবাজারের নতুন কমিশন এ অবস্থার পরিবর্তনে কাজ করছে। এখন যাতে তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই আইপিও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়, সে লক্ষ্য নিয়ে তারা এগোচ্ছে।

এছাড়া সিকিউরিটিজ নীতিমালায় কিছু বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আইপিওর অর্থ দিয়ে ব্যাংক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে যে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশের বাধ্যবাধকতা ছিল, তাতে শিথিলতা আনা হচ্ছে। পাশাপাশি সরাসরি তালিকাভুক্তির (ডাইরেক্ট লিস্টিং) সুযোগও পুনরায় চালুর চিন্তাভাবনা চলছে।

জানা গেছে, বিশ্বজুড়ে উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে অবকাঠামো ও শিল্প খাতের অর্থায়নে প্রধান ভূমিকা রাখে পুঁজিবাজার। করপোরেট বন্ড, সুকুক ও গ্রিন বন্ডের মাধ্যমে সেসব দেশে মেগা প্রকল্পগুলোর মূলধন সংগৃহীত হয়। ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উন্নত দেশগুলোতে জিডিপির তুলনায় পুঁজিবাজারের মূলধনের অনুপাত ৮০ থেকে ১২০ শতাংশ পর্যন্ত। অথচ বাংলাদেশে এই অনুপাত ১০ শতাংশেরও নিচে। দীর্ঘমেয়াদি মেগা ঋণের পুরো বোঝা ব্যাংক খাতের ওপর চাপানোর ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট জটিল রূপ ধারণ করছে।

জানা গেছে, পুঁজিবাজারে ভালো শেয়ারের চরম ঘাটতি ও একমুখী ইকুইটি নির্ভরতায় বাংলাদেশের পুঁজিবাজার অতিমাত্রায় ইকুইটিনির্ভর। নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বন্ড মার্কেট বা মিউচুয়াল ফান্ড খাত শক্তিশালী হতে পারেনি। এছাড়া বাজারে ভালো ও মৌলিকভাবে শক্তিশালী (ফান্ডামেন্টাল) শেয়ারের চরম ঘাটতি রয়েছে।

বিগত বছরগুলোতে যেসব আইপিও এসেছে, তার অনেকগুলোই মানহীন হওয়ায় কিছুদিন পর লোকসানি বা ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে পরিণত হয়েছে। ভালো বহুজাতিক ও দেশি বড় কোম্পানিকে বাজারে আনতে কার্যকর নীতিগত কর-প্রণোদনা না থাকায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে ভরসা পাচ্ছেন না।

অন্যদিকে একই সময়ে ভারতে মূল বাজারে ১৯৭টি এবং এসএমই বাজারে ৪৭৮টি আইপিও সম্পন্ন হয়েছে। এসব আইপিওর মাধ্যমে মূল বাজার থেকে ৩ লাখ ৫১ হাজার ২৫৩ কোটি রুপি এবং এসএমই বাজার থেকে ২১ হাজার ৭৯৯ কোটি রুপি সংগ্রহ করা হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ায় একই সময়ে মূল বাজারে ৪২টি এবং এসএমই বাজারে একটি আইপিওর মাধ্যমে যথাক্রমে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ কোটি ও ৩০০ কোটি রুপিয়াহ সংগ্রহ করা হয়েছে। মালয়েশিয়ায় মূল বাজারে ২৩টি এবং এসএমই বাজারে ১০৭টি আইপিওর মাধ্যমে যথাক্রমে ১ হাজার ২০ কোটি ও ৬০০ কোটি রিংগিত সংগ্রহ করা হয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশে মূল ও এসএমই—উভয় বাজারেই আইপিওর সংখ্যা এবং তহবিল সংগ্রহের পরিমাণ ছিল শূন্য।