মেহেদী হাসান, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সব ব্রোকারেজ হাউজের জন্য একটি ইউনিফাইড ও অত্যন্ত সুরক্ষিত ব্যাক অফিস সফটওয়্যার চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি বলেছেন, ডিজিটাল যুগে ব্রোকারেজ হাউজের ব্যাংক হিসাব ও সিসিএ (কাস্টমার ক্লিয়ারিং অ্যাকাউন্ট) হিসাবে থাকা অর্থের রিয়েল-টাইম তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এর মাধ্যমে প্রতিদিন অর্থের পুনর্মিলন (রিকনসিলিয়েশন) করা সম্ভব হবে এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থের ঘাটতি বা অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করা যাবে।

আজ সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) আয়োজিত ‘আইপিএফ তহবিল বিতরণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে’ তিনি এসব কথা বলেন। ব্রোকারেজ হাউজ কর্তৃপক্ষের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অর্থ বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন উপলক্ষে এ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, পাঁচটি সিকিউরিটিজ হাউজে ৪৯২ কোটি টাকার আর্থিক অস্বচ্ছতার ঘটনায় ১৭ হাজার ৯৬৭ জন বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুঞ্জীভূত এই সমস্যার সমাধান প্রয়োজন ছিল। আজকের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সেই সমাধান প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

মাসুদ খান বলেন, আজকে যে সমাধান আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, এটা ডিএসইর কোনো একক কৃতিত্ব নয়। এটা বিএসইসির কোনো একক কৃতিত্ব নয়। এটা ইনভেস্টরস ফোরামেরও একক কৃতিত্ব নয়। এটা আমাদের সম্মিলিত চেষ্টা। এই টিমওয়ার্কটা যদি না থাকত, আপনারা হয়তো আজকের অনুষ্ঠানটি দেখতে পেতেন না।

তিনি বলেন, ডিএসইর পক্ষ থেকে যে প্রত্যাশা বিএসইসির কাছে করা হয়েছিল, কমিশন তা পূরণ করেছে। একইভাবে ইনভেস্টরস প্রটেকশন ফান্ড (আইপিএফ) নিয়ে দ্রুত কাজ করায় সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান তিনি।

আইপিএফের উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, তহবিলটি মূলত সেটেলমেন্ট ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বিনিয়োগ করা অর্থ আত্মসাতের মতো ঘটনা ঘটায় এর ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা ভিন্নভাবে সামনে এসেছে। এছাড়া যারা আস্থা নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের কষ্টের টাকা আত্মসাৎ করা এটা সত্যিই আমি জানি না, অন্য দেশে এরকম ঘটনা এত স্কেলে হয় কি না।

এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থার ওপর জোর দেন মাসুদ খান। তিনি বলেন, ডিএসইর সঙ্গে ইতোমধ্যে একটি শক্তিশালী ব্যাক অফিস সফটওয়্যার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ফলে একটা ইউনিফাইড ওয়ান ব্যাক অফিস সফটওয়্যার, যেটা হবে হাইলি প্রটেক্টেড এবং ব্রোকারদের রিয়েল-টাইম ডেটা দেবে এটা করতে হবে। যাতে প্রতিদিন আমরা পুরো রিকনসিলিয়েশন দেখতে পারি।

তিনি বলেন, ব্রোকারেজ হাউজের ব্যাংকে কত টাকা আছে এবং সিসিএ অ্যাকাউন্টে কত টাকা আছে সেই তথ্য নিয়মিত যাচাই করা প্রয়োজন। এ ধরনের ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সরাসরি তদারকির চাপও কমবে। পাশাপাশি অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ওএমএস) নিয়েও এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
মাসুদ খান বলেন, এই ডিজিটাল যুগে আমাদের এটাকে অবশ্যই করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপরও গুরুত্ব দেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কঠিন জীবনযাপন করছেন। এ ধরনের ঘটনা পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরির অন্যতম কারণ। আমাদের বিনিয়োগকারীরা যেন এই আস্থাটা পুনরায় ফেরত পেতে পারেন আমরা সেই চেষ্টা করবো।

ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে মাসুদ খান বলেন, আইপিএফের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে সব বিনিয়োগকারীর অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ৫ লাখ টাকার নিচে পাওনা থাকা বিনিয়োগকারীদের পুরো অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৯৬ শতাংশের পাওনা ৫ লাখ টাকার নিচে।

ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে এই শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের পুরো অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে ৫ লাখ টাকার বেশি পাওনা থাকা বিনিয়োগকারীদেরও অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। মাসুদ খান বলেন, আপতত ৫ লাখ টাকার নিচে যারা আছেন, তাদের পুরোটাই ফেরত দেওয়া হবে এবং পর্যায়ক্রমে আলটিমেটলি সবাইকেই কাভার করা হবে।