বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: নানা অনিয়ম ও ব্যর্থতায় ডুবছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের এক সময়কার স্বনামধন্য কোম্পানি প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির কয়েক হাজার গ্রাহক দীর্ঘদিন তাদের পাওনা টাকা (বিমা দাবি) পাচ্ছেন না। এরই মধ্যে বিভিন্ন সময়ে কোম্পানির মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্বে মামলা। ফলে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও সুশাসনের ঘাটতি এবং শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ উঠেছে।

কোম্পানির বর্তমান চেয়ারম্যান বজলুর রশীদের বিরুদ্ধে ২০২৪ ও ২০২৫ অর্থবছরের বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আয়োজন না করার অভিযোগ করেছেন স্পন্সর পরিচালক নাসির আলী শাহসহ কয়েকজন শেয়ারহোল্ডার। সম্প্রতি এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কাছে আবেদন জানিয়েছেন তারা। এরপরও যেন অনিয়মের শেষ নেই জীবন বিমা খাতের এই কোম্পানিটি ঘিরে।

অভিযোগকারীদের দাবি, চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ঢাকা-লন্ডন যাতায়াতের বিমান টিকিটসহ বিভিন্ন ভ্রমণ ব্যয় এবং দৈনিক আপ্যায়ন খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ কোম্পানির তহবিল থেকে ব্যয় করা হয়েছে। এছাড়া লিগ্যাল ও উন্নয়ন ব্যয়ের নামে অতিরিক্ত অর্থ খরচ, পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ এবং কোম্পানির সম্পত্তি বিক্রির প্রস্তাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। উদ্যোগক্তাদের অভিযোগ, এ ধরনের ব্যয় ও সিদ্ধান্তের যথার্থতা ও স্বচ্ছতা এবং কোম্পানির আর্থিক স্বার্থের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

অভিযোগপত্রে কোম্পানির আর্থিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কোম্পানির সম্পদের তুলনায় আর্থিক দায়ের পরিমাণ আশঙ্কাজনক এবং নগদ প্রবাহের পরিস্থিতিও নেতিবাচক। এ অবস্থায় অতিরিক্ত ব্যয় ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা কোম্পানির আর্থিক স্থিতিশীলতাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

এরই মধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ শিক্ষাসনদে নিয়োগ পেয়েও বহাল তবিয়তে রয়েছেন প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মুহাম্মদ সাইদুল আমিন। সনদ নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও তার এই নিয়োগে অনুমোদন দিয়েছিল বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। একটি শিক্ষাসনদ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের, অন্যটি বিতর্কিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা’র। এই বিতর্কিত শিক্ষাসনদে সিইও হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র সঙ্গে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জানা যায়, আইডিআএ’র একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা সাইদুল আমিনকে এই পদে বহাল তবিয়তে রাখতে নেপথ্যের নায়ক হিসেবে কাজ করছেন। এছাড়া পূর্ববর্তী কোম্পানিতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং ব্যবসায়িক টার্গেট অর্জনেও হয়েছেন ব্যর্থ সাইদুল আমিন। আগের কর্মস্থল মার্কেন্টাইল লাইফ ইন্স্যুরেন্সে সনদ জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ পেলে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন। এর আগে মার্কেন্টাইল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে সিইও হিসেবে নিয়োগ অনুমোদনের আগেই তার এমন জালিয়াতির কথা প্রকাশ পায়। স্পষ্ট জালিয়াতির প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পরবর্তীতে এমন ব্যক্তি কীভাবে সিইও হিসেবে নিয়োগ পান তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ বিমা-সংশ্লিষ্টরা।

সাইদুল আমিন ২০২৩ সালের ২৩ নভেম্বর প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সে যোগদান করেন। এরপর প্রগ্রেসিভ কর্তৃপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের মার্চে তাকে অনুমোদন দেয় আইডিআরএ। এদিকে সাইদুল আমিন নিয়োগ পাওয়ার পরও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি চতুর্থ প্রজন্মের এই কোম্পানিটি। অনিয়ম অব্যবস্থাপনা আর লুটপাটের কারণে গ্রাহকের কোটি কোটি টাকার বিমা দাবি পরিশোধ করতে পারছেনা প্রগ্রেসিভ লাইফ।

দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণের হাতে আসা মুহাম্মদ সাইদুল আমিনের ‘দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা’র শিক্ষাসনদ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তিনি ব্যাচেলর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা বিবিএ সনদ অনুযায়ী মার্কেটিং বিভাগ থেকে ২০০১ সালে সিজিপিএ ৩.৪৮ পেয়ে পাস করেছেন। আর সনদ ইস্যু করা হয়েছে ২০০২ সালের জানুয়ারি মাসের ২৩ তারিখে। সনদে আইডি/রোল উল্লেখ করা হয়েছে ৯৮১৯১৯।

আইডিআরএ’তে দাখিল করা সনদে রোল নম্বরটির জায়গা অস্পষ্ট থাকায় এটা ভালোভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। রেজিস্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে ৯৮১৯ । সনদটির সিরিয়াল নম্বর ৯৮। মুহাম্মদ সাইদুল আমিন একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এমবিএ করেছেন ২০০২ সালে। মার্কেটিং বিভাগে পেয়েছেন ৩.৬৩। তার এই সনদটি ইস্যু করা হয়েছে ২০০৪ সালের ২৩ জানুয়ারি। সনদ দুটি ইস্যুর তারিখ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়টির অনুমোদন আছে কি না এমন তথ্য অনুসন্ধান করা হয়। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ওয়েবসাইট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অমান্য, প্রশাসনিক অব্যস্থাপনা, অর্থনৈতিক অস্বচ্ছতা এবং মানহীন শিক্ষাব্যবস্থার কারণে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে ইউজিসি।

পরবর্তীতে সরকার কর্তৃক বন্ধ আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট মামলা দায়ের করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, যার রিট পিটিশন নং-১৬৭১/২০১৪। এরপর প্রায় এক দশক পর আদালতের রায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রমের পক্ষে গেলেও নানা জটিলতার কারণে অনুমতি পায়নি ইউজিসির। ফলে এখনো স্থগিত রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষাকার্যক্রম।

ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেন, ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা, এর তো অনুমোদনই নেই; সুতরাং এখান থেকে যে সার্টিফিকেট প্রদান করা হবে, সেটা ভুয়া। এই প্রতিষ্ঠানের সনদপত্র ব্যবহার করে চাকরি করার সুযোগ নেই।

জানা যায়, পূর্ববর্তী কর্মস্থল মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সেও ভালো পারফরম্যান্স দেখাতে পারেননি সাইদুল আমিন। প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় দক্ষতার ঘাটতি এবং ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব কারণে তাঁকে চাকরি ছাড়তে হয়েছিল বলে জানা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পদে নিয়োগ পেতে তিনি বিভিন্ন মহলে তদবির করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ তুলে কোম্পানির এক কর্মকর্তা অর্থ মন্ত্রণালয় ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চিঠিও পাঠিয়েছিলেন। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সিইও পদে নিয়োগ পেতে সাইদুল আমিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে প্রায় ৪০ লাখ টাকা লেনদেন করেছিলেন। সেই চিঠিতে তাঁর শিক্ষাসনদ জালিয়াতির অভিযোগও তুলে ধরা হয়।

এদিকে মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডে যোগদানের পূর্বে তিনি যে কোম্পানিতে কাজ করেছেন, সেখানে জমা দেয়া সিভিতে তিনি বিএ পাস উল্লেখ করেছেন। তার সেই শিক্ষাসনদও এসেছে দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণের হাতে। বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যায়ের অধীনে তৎকালীন সরকারি জগন্নাথ কলেজ থেকে ১৯৯৪-৯৫ সেশনে রসায়ন বিভাগ থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে তিনি স্নাতক শেষ করেন। পরীক্ষা দেন ১৯৯৭ সালে। এই সনদটি ইস্যু করা হয় ২০০০ সালের ৪ জানুয়ারি। সনদ অনুযায়ী তার রোল নম্বর ১৫৭৬৫।

অন্যদিকে তিনি ওই প্রতিষ্ঠান থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তরও করেছেন ১৯৯৪-৯৫ সেশনে! তবে তার এই সনদটি কবে ইস্যু করা হয়েছে তা নিশ্চত হওয়া যায়নি। কারণ, প্রাপ্ত সনদটিতে বেশকিছু জায়গায় ঘষামাজা করা হয়েছে। ওই সনদে তার রোল নম্বর ৩৭৪৮৬। পরীক্ষা দিয়েছেন ১৯৯৮ সালে। আর পাসের সন দেখানো হয়েছে ২০০১। তবে দুটি সনদ নিয়েই ‘সন্দেহ’ প্রকাশ করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। খোদ বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইডিআরএ তার শিক্ষাসনদে ‘আস্থা’ রাখতে না পেরে সনদ যাচাইয়ের কার্যক্রমও শুরু করেছিল।

শিক্ষাবিদদের মতে, একই সেশনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার সুযোগ নেই। মুহাম্মদ সাইদুল আমিনের শিক্ষাসনদ দুটির যথার্থতা যাচাই করতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, একজন শিক্ষার্থীর একই সেশনে অনার্স ও মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার সুযোগ নেই। সে ক্ষেত্রে সনদ দুটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শহিদুল ইসলাম জাহীদ বলেন, একই সনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করার সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, বিমা খাতের স্বচ্ছতা এবং সুশাসন নিশ্চিতে কর্তৃপক্ষের উচিত এসব বিষয় ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করা। তবে আইডিআরএ তার এই সনদে বিশ্বাস রাখতে না পেরে যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। এর অংশ হিসেবে ২০২৩ সালের ১১ জুন মুহাম্মদ সাইদুল আমিনের পূর্ববর্তী কর্মস্থল ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের মুখ্য নির্বাহী বরাবর চিঠিও দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি।

আইডিআর‘র তৎকালীন পরিচালক (উপসচিব) মোহা. আব্দুল মজিদ স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক এসইভিপি মুহাম্মদ সাইদুল আমিনের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের সঠিকতা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক যাচাই করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে সাইদুল আমিনের নিয়োগের সময়ে দাখিলকৃত সব শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ এবং জীবনবৃত্তান্তের দলিলাদি কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে তিন কার্যদিবস সময় দিয়েছিলো আইডিআরএ।

এদিকে দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা শুরু থেকেই সনদবাণিজ্যের জন্য বিতর্কিত। এই অপরাধে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ইউজিসি ২০০৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির সনদ অবৈধ ঘোষণা করে। ২০২৩ সালে এক বিজ্ঞপ্তিতে দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লার বিষয়ে ইউজিসি বলে, এ বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৯৯৫ সালে সরকারের অনুমোদন পায়। কিন্তু আইন না মানায় ২০০৬ সালে সরকার এটি বন্ধ করে দেয়।