মো: সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন: একটি স্থিতিশীল পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে শুধু বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারী কিংবা উচ্চ লেনদেন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভারসাম্য, নির্ভরযোগ্য তথ্য, পর্যাপ্ত তারল্য এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার ওপর আস্থা। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে লেনদেনের প্রায় অধিকাংশই খুচরা বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। প্রশ্ন হলো—শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ ছাড়া এমন বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা কতটা সম্ভব?

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে লেনদেনের প্রায় ৯০ শতাংশ খুচরা বিনিয়োগকারী, ৫ শতাংশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, ৩ শতাংশ ডিলার বা ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান এবং ২ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগকারীর মাধ্যমে হয়। তুলনামূলকভাবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে খুচরা বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ যথাক্রমে প্রায় ৪০ ও ৫০ শতাংশ। অবশিষ্ট অংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে হয়। দক্ষ ও গভীর পুঁজিবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড, পেনশন ফান্ড ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর শক্তিশালী উপস্থিতি থাকে।

বাংলাদেশে এএমসি ও মিউচুয়াল ফান্ড থাকলেও বাজারে তাদের অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। অতীতে কিছু বিনিয়োগবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় এ খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই আস্থা পুনরুদ্ধারে এ খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবমুক্ত স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

খুচরা বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ নিজে কোনো সমস্যা নয়। তাঁরা বাজারে তারল্য সরবরাহ করেন, শেয়ার মালিকানার বিস্তার ঘটান এবং সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করেন। সমস্যা তৈরি হয় যখন পর্যাপ্ত গবেষণা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে আবেগনির্ভর সিদ্ধান্ত এবং স্বল্পমেয়াদি ফটকামূলক লেনদেন বাজারের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।

ভবিষ্যতের পুঁজিবাজারে খুচরা বিনিয়োগকারীরা থাকবেন গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণকারী হিসেবে, আর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা হতে পারেন বাজারের গভীরতা ও দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে আবেগ ও স্বল্পমেয়াদি লেনদেননির্ভর কাঠামো থেকে গবেষণা, সুশাসন ও দীর্ঘমেয়াদি আস্থাভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে পারলেই একটি স্থিতিশীল পুঁজিবাজার পাওয়া যাবে। অন্যথায় এটি বহু যুগ ধরে অস্থিতিশীল থাকবে।

দলবদ্ধ মানসিকতা, সুযোগ হারানোর ভয় এবং লোকসান এড়ানোর প্রবণতা তাঁদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। বাজার ঊর্ধ্বমুখী হলে গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা কিংবা সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে জনপ্রিয় শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়ে। এতে কোনো কোনো শেয়ারের মূল্য কোম্পানির মৌলভিত্তির তুলনায় দ্রুত বেড়ে যায়। বিপরীতে, বাজারের মনোভাব বদলালে একই ধরনের সম্মিলিত আচরণ দ্রুত বিক্রির চাপ তৈরি করে।

ঋণনির্ভর বিনিয়োগ এই ঝুঁকি আরও বাড়ায়। শেয়ারের দাম কমলে মার্জিন কলের কারণে বাধ্যতামূলক বিক্রি বেড়ে যায়। অনেক ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীর দীর্ঘস্থায়ী লোকসান মোকাবিলার আর্থিক সক্ষমতাও সীমিত। একই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক ক্রয় দুর্বল থাকলে বিক্রির চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে স্বাভাবিক বাজার সংশোধনও কখনো গভীর দরপতনে রূপ নিতে পারে।

এদিকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণ একই সঙ্গে একটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র। এএমসি, মিউচুয়াল ফান্ড, ব্যাংক ও বিমা কোম্পানি, অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং পেনশন ফান্ড স্বাধীন গবেষণা, কোম্পানির আয়, নগদ প্রবাহ, সম্পদ, ঋণ, সুশাসন ও অন্তর্নিহিত মূল্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে পারে।

মৌলভিত্তি শক্তিশালী কোনো কোম্পানির শেয়ার যৌক্তিক মূল্যায়নের নিচে নেমে এলে পর্যাপ্ত অর্থ ও সুশৃঙ্খল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের সুযোগ নিতে পারে। এতে বাজারের গভীরতা ও মূল্য আবিষ্কার প্রক্রিয়া শক্তিশালী হবে এবং ফটকামূলক লেনদেনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ারহোল্ডারদের সক্রিয় ভূমিকা তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, সুশাসন ও জবাবদিহি বাড়াতে সহায়ক হবে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজার স্থিতিশীল করবেন—এমন ধারণাও সঠিক নয়। দুর্বল সুশাসন, অতিরিক্ত বিনিয়োগ কেন্দ্রীভবন, অপর্যাপ্ত গবেষণা বা তহবিল প্রত্যাহারের চাপ প্রতিষ্ঠানকেও ঝুঁকিপূর্ণ করতে পারে। তাই পেশাদার ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি অপরিহার্য।

প্রথমত, এএমসি, মিউচুয়াল ফান্ড, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিমা ও পেনশন ফান্ডের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে মৌলভিত্তি শক্তিশালী, বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিত্বকারী ও বৈচিত্র্যপূর্ণ তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে হবে, যাতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি বৈচিত্র্যকরণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ পান। প্রয়োজনে এনবিআর দীর্ঘমেয়াদি পুঁজিবাজার বিনিয়োগে লক্ষ্যভিত্তিক কর-প্রণোদনা বিবেচনা করতে পারে। তবে এ ধরনের প্রণোদনা অবশ্যই রাজস্ব স্থায়িত্ব, বাজারের স্বচ্ছতা ও যথাযথ সুরক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

দ্বিতীয়ত, এএমসিগুলোকে স্বচ্ছ নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) প্রকাশ, বিশ্বাসযোগ্য কার্যসম্পাদন প্রতিবেদন, যৌক্তিক ব্যবস্থাপনা ফি, স্বাধীন তদারকি এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে খুচরা বিনিয়োগকারীরা তাদের মাধ্যমে বিনিয়োগে আগ্রহী হন। শুধু পেশাদার সম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রতিশ্রুতি নয়—কার্যসম্পাদন, সুশাসন ও জবাবদিহির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে হবে।

তৃতীয়ত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বাজার মধ্যস্থতাকারীদের তথ্য প্রকাশ, বাজার তদারকি, কারসাজি প্রতিরোধ এবং বিনিয়োগকারী শিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। লক্ষ্য খুচরা বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমানো নয়; বরং তাঁদের তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল বিনিয়োগে সক্ষম করা।

বিষয়টি খুচরা বনাম প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর নয়; একটি টেকসই পুঁজিবাজারে উভয়েরই প্রয়োজন। খুচরা বিনিয়োগকারীরা সরাসরি বাজারে অংশগ্রহণের পাশাপাশি মিউচুয়াল ফান্ড ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ব্যবস্থার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারেন। অন্যদিকে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা গবেষণা, ধৈর্যশীল মূলধন ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব বিনিয়োগকে আরও সুশৃঙ্খল, দীর্ঘমেয়াদি ও তথ্যভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালনার সুযোগ তৈরি করবেন। এতে বাজারে তারল্য, মূল্য আবিষ্কার ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।

ভবিষ্যতের পুঁজিবাজারে খুচরা বিনিয়োগকারীরা থাকবেন গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণকারী হিসেবে, আর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা হতে পারেন বাজারের গভীরতা ও দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে আবেগ ও স্বল্পমেয়াদি লেনদেননির্ভর কাঠামো থেকে গবেষণা, সুশাসন ও দীর্ঘমেয়াদি আস্থাভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে পারলেই একটি স্থিতিশীল পুঁজিবাজার পাওয়া যাবে। অন্যথায় এটি বহু যুগ ধরে অস্থিতিশীল থাকবে।

লেখক : ফেলো মেম্বার অব আইসিএমএবি। sajjad.hossain@squaregroup.com